এক আলোকময়ীর কথকতা/পাপড়ি রহমান

এক আলোকময়ীর কথকতা/পাপড়ি রহমান

এক আলোকময়ীর কথকতা
পাপড়ি রহমান

এ সম্পর্কের প্রারম্ভ ছিল, কিন্তু পরিশেষ নেই। কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য-অমলিন সম্পর্কে চিরতরে যুক্ত হয়ে যেতে হয়। এ যেন কোনো এক ছায়াচ্ছন্ন-বনস্পতি আর ক্ষুদ্র-ধূলিকণার গল্প! কঠিন-মৃত্তিকার বাদামী-বরন শরীরকে ধূলি করে পড়ে থাকা আর নিজেকে বিছিয়ে রাখা বিরাটাকায় সেই অশ্বত্থের তলে। যদি কিছু শুকনো-পাতার স্পর্শ তার জোটে। যদি কিছু স্নেহশীল-পত্র ঝরে পরে তার দেহ ‘পরে! আর কিছু ছায়া। কিছুটা মায়া। কিংবা কোনোদিন যদি জোর-হাওয়া বয়, তাহলে সে যেন পলকে উড়ে যেতে পারে সেই বনস্পতির কাছাকাছি। নিতে পারে আশ্রয় তাঁর স্নেহের-আঙিনায়। অশ্বত্থের সন্নিকটে সে তাই ধূলি হয়েই পড়ে থাকতে চায়। যদি কোনোদিন ঝরে মুষল-বাদল, অবিরল— তাহলে ধূলির মৃত্যু হয় । ফের সে মৃত্তিকার-উদর থেকে জন্ম লাভ করে। ফের সে ধূলি হয়। ফে্র ক্ষুদ্রকণা। ফের নিজেকে বিছিয়ে রাখা মাটির ‘পরে। ফের তার প্রত্যাশা—কিছু শুকনো-পাতার স্পর্শ লভিবার!
এ এক অন্য অশ্বত্থের গল্প। অন্য বটের গল্প। অন্য পাকুড়ের গল্প। বট-পাকুড়-অশ্বত্থের বিস্তৃত-ছায়ার-গল্প! বিস্তীর্ণ-সবুজের গল্প। এই রাজধানীর ক্লেদ, ক্লেশ, ক্লান্তি, কুসম, কোলাহল আর কুটিলতা-মোড়া-জীবনের মাঝে অক্সিজেন-পূর্ণ এক-টুকরো দ্বীপের-গল্প! এক অতিচেনা সবুজ-মানবীর নিত্যদিনের চেনা-গল্প! যে কীনা নিজেই মাটির দিকে ঝুঁকে থাকেন অহর্নিশ! অনায়াসে কোলে তুলে নেন পথকলিদের। যে কীনা ধূলিতে ধুলাকার হতে হতে অভয়ের শাখাটি, স্নেহের-পাতাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলেন—
‘শোনো মেয়ে, যুদ্ধ করে টিকে থাকার নামই জীবন।‘
‘শোনো মেয়ে, আমি তোমার কোনো ব্যক্তিগত ঝামেলার কথা শুনব না। কাজের কথা থাকলে বলো।‘
‘দেখো পাপড়ি, কাজ কর। কাজ কর। কাজ ছাড়া আর কোনোকিছুই টিকে থাকে না।‘
এসব কথা আমায় বলেছেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। বলেছেন মিউজিয়াম থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সেমিনার শেষ করে বের হয়ে। বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ অডিটরিয়ামের মঞ্চ থেকে নেমেই। অথবা আমি যখন কারো কাছেই শান্তি না পেয়ে আপার বাসায় ছুটে গিয়েছি, তখনও আমাকে তিনি এসবই বলেছেন।
এই যে আমি— জীবনের বন্ধুর-পথে হাঁটতে হাঁটতে শত-সহস্রবার মুখ-থুবড়ে পড়ে যাওয়া আমি— এসবের সবকিছুই ছিল আমার জন্য অনুপ্রেরণা। আমার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি। নিজের কাজ নিয়ে বিভোর হতে পারার জ্বালানি।
তাঁর এসব কথা শুনতে শুনতেই আমি নিজেকে একদিন বলতে পেরেছি—
হে আমার আগুন তুমি আবার ওঠো জ্বলে/ তোমার ওই আদিম জ্বালার কিছুই নেই বাকি ?/ হে আমার আগুন আমার পালিয়ে যাওয়া পাখি/ স্ফুলিঙ্গ ডানায় তোমার উঠুক জ্বলে জ্বলে/
আহ! কত শত-সহস্র কথামালা আমি আর তাঁকে নিয়ে লিখব? কত অযুত-নিযুত সঙ্গীত? কত কী, কী পরিমাণ বললে আমার নিজেকে নির্ভার মনে হবে? বা মনে হবে তাঁর অশেষ-স্নেহের প্রতিদানে একবিন্দু-নিশাজল তাঁর করকমলে আমি রাখতে পেরেছি শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে?
বাংলা একাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্পের’ কোর্স অন্তে আমার পাণ্ডুলিপির রিভিউয়ার ছিলেন অগ্রজ কথাসাহিত্যিক বশীর আল হেলাল। বশীর আল হেলালের লিখিত মূল্যায়নপত্রের ফটোকপিটি আমার হাতে তুলে দিতে দিতে তিনি বলেছিলেন—
শোনো পাপড়ি, বশীর আল হেলালের করা মন্তব্য কিন্তু হেলাফেলার নয়। উনি অত্যন্ত উঁচু মানের একজন সাহিত্যিক। উনার এই আশীর্বাদ তুমি মনে রেখো।
তারপর থেকে কত বন্ধুর-পথে, কত ঝড়-জলে, কত বেদনা-বিষাদে, কত খরা ও মারীতে, কত নোংরা রাজনীতিতে এই ধরাশায়ী আমাকে তিনি আগলে রেখেছেন। আমি উনার গর্ভে জন্মাইনি ঠিকই, কিন্তু উনি আমাকে দিয়েছেন মাতৃস্নেহ। দিয়েছেন অপার-মমতা। দিয়েছেন অনিঃশেষ স্নেহের বরাভয়।

তাঁর উপন্যাস ‘লারা’ পড়ে আমি সারারাত কেঁদেছিলাম। এরপর বহুদিন আমি তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি। বাংলা একাডেমির পরিচালক তখন তিনি। তাঁর রুমের দরোজার ঝুলানো পর্দার আড়াল থেকে তাঁকে দেখেই সরে এসেছি। আমি কীভাবে যাব তাঁর সামনে? আমি নিজেও তো ততদিনে মা হয়েছি। একজন সন্তান মাকে কতোটা যন্ত্রণা দিয়ে, মায়ের হাড়মাংশ একাকার করে দিয়ে, স্বপ্নের ফুলগুলি ফুটিয়ে দিয়ে এই পৃথিবীতে আসে— আমি তা জেনেছি। সুতরাং শোকের পাথরে খোদাই করা ওই মায়ের মুখের সামনে থেকে পালিয়ে বেড়ানোই উত্তম বিবেচনা করেছি। তারপর একদিন নয়নের অশ্রু লুকাতে লুকাতে উনার মুখোমুখি হয়েছি। উনি বিষাদ-ক্লিষ্ট মুখের রেখা আড়াল করতে করতে কাজের কথা বলেছেন। উনাকে দেখেই আমি জেনেছি, কর্মই ধর্ম। কর্মই জীবন! কর্ম বিনে আর কিছু নাই ইহজীবনে।
অবিশ্রাম লিখে যাচ্ছেন তিনি। দুহাতে লিখছেন! ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’, ‘মগ্ন চৈতন্যে শিষ’, ‘আণবিক আঁধার‘, ‘মোহিনীর বিয়ে’, ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘ভূমি ও কুসুম’, ‘কাঠ কয়লার ছবি’, ‘যুদ্ধ’, ‘ঘুম কাতুরে ঈশ্বর’, ‘আগস্টের একরাত‘, ‘গেরিলা ও বীরাঙ্গনা‘ এরকম অজস্র গ্রন্থের স্রষ্টা তিনি। গল্প-উপন্যাসের বাইরে করেছেন অজস্র সম্পাদনা, গবেষণা। তাঁর কাজের ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। তাঁর কাজের তালিকা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়।
সেলিনা হোসেনের এই বিশাল-কর্মযজ্ঞ আমাকে মাঝেমাঝেই হতবিহ্ববল করে তোলে। কী করে পারেন তিনি এত কাজ করতে? কীভাবে পারেন? এত এনার্জি আপা কীভাবে পান? কই থেকে পান? এক একেকটা বইয়ের পেছনে একজন লেখকের যে পরিশ্রম, তা লেখক মাত্রেই জানেন। অন্য কেউ এ বিষয়ে কোনো ধারণাই করতে পারবেন না।
এক যুগ আগে এক সার্ক লিটেরারি ফেস্টে দিল্লীতে গিয়েছিলাম। আমাদের রাখা হয়েছিল একটা আশ্রমে। আমি কৌতুহল-বশত জানতে চাইছিলাম, আর কে কে আছে আমাদের এই আশ্রমে? ফলত রিসিপশনে গিয়ে গেস্টলিস্ট চেক করা। সহসা দেখি সেলিনা হোসেনের নাম। আমি কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চাইলাম, আপা এখানে আছেন নাকি?
রিসিপশনিস্ট জানালেন—
উনাকে ফাইভ স্টার হোটেলে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু উনি সেখানে থাকেননি।
পরেরদিন সকাল আটটা বাজতে না বাজতেই আশ্রমে ব্রেকফাস্টের ঘন্টা বেজে গেল। লাইন ধরে নিজেদের প্লেট/ খাবার নিচ্ছি সবাই। দেখি সেলিনা আপাও লাইনে আছেন আমাদের সঙ্গে। এক কাতারে দাঁড়িয়ে আমাদের সাথেই খাবার নিলেন। বসলেন আমাদের টেবিলে।
আমি জানতে চাইলাম—
আপা, আপনি এখানে কেন?
উনি ব্রেকফাস্টের সেই বিদঘুটে ভেজ— মানে গম-যবের খিচুড়ি খেতে খেতে বললেন—
আমাকে দিয়েছিল অন্য একটা হোটেলে। আমি যাইনি। ওদের বলেছি আমাদের মেয়েদের যেখানে রেখেছ সেখানেই রাখো আমাকে।
এরপরে যতবার সার্ক লিট ফেস্টে গিয়েছি, আপাকে আমাদের মাঝেই পেয়েছি। আপা ফাইভ স্টার হোটেলের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে আমাদের সাথে তিন বা চার তারকার হোটেলেই অবস্থান করেছেন। কখনো-বা পাঁচতারকার ঝলমলে মনকাড়া হাতছানিতে একাত্ম হয়েছেন, কিন্তু তা আমাদের সাথে নিয়েই।
সেলিনা হোসেনের এইসব একাত্মতা যেমন দেখেছি, পাশাপাশি অন্য দু-একজনের উন্নাসিকতাও দেখেছি। অনেক অগ্রজ নারীলেখকদের অসূয়া-ইর্ষা, তাঁদের ছুঁড়ে দেয়া তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের-তীর আমাদের হরহামেশাই বিদ্ধ করেছে। কি আর করা? এই নমশূদ্র-জীবনে ব্রাক্ষ্ণণদের উপহাস তো সইতেই হবে!
বনস্পতির ছায়া হয়ে তিনি আছেন— এটাই অনেক বেশি ভরসা দেয় আমাকে। সাহস দেয়। শক্তি যোগায়। প্রার্থনা জানাই, তিনি বেঁচে থাকুন অনেককাল।
আগামীকাল আপার ৭৫তম জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় আপা।
সুস্থ থেকে শতায়ূ হোন।

Leave a Reply