পাপড়ি রহমানের ‘করুণ ক্যাসিনো’: মাইনুল এইচ সিরাজী

পাপড়ি রহমানের ‘করুণ ক্যাসিনো’: মাইনুল এইচ সিরাজী

ব্যাভার মানে হচ্ছে উপহার। বিয়ের সময় বরপক্ষের মহিলা আত্মীয়-স্বজনকে কনেপক্ষ থেকে শাড়ি উপহার দেওয়ার চল ছিল এক সময়। নোয়াখালীতে এটাকে বলে ব্যাফার। তরজার বেড়া মানে বাঁশের বেড়া।
খালে কিংবা পুকুরে কচুরিপানার জঙ্গল থেকে কই মাছ ধরেছেন কখনো? দাড়ির মতো কালো কালো কচুরিপানার শিকড়ের সঙ্গে কই মাছ আটকে থাকে। খুব আলগোছে সেটাকে ধরতে হয়। এভাবে কই মাছ ধরে ছোটবেলায় আমরা বলতাম, ‘আইজকা দাদায় আর আমি তুমারে ভাজাভাজা কইরা খামু।’ যেমনটা বলেছে পাপড়ি রহমানের গল্প ‘গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ’-এর জলিল।
খলিল-জলিল দুই ভাই। রোজ তুরাগে নাও ভাসায়। জলপুষ্পের প্রতি জলিলের দুর্নিবার আকর্ষণ–‘টাগইয়ের ফুল তুলুম। ফুল তুলুম। লও যাই।’
পড়ছিলাম পাপড়ি রহমানের সদ্যপ্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘করুণ ক্যাসিনো’। আমি বরাবরই এই লেখকের গল্পভাষার স্বাদ গ্রহণ করি ধীরেসুস্থে। নাক পর্যন্ত টানা ঘোমটা আলতো করে ওল্টালে নতুন বউয়ের টিকলি যেমন ফিনিক দিয়ে ওঠে, সে রকম মুগ্ধতায় পেয়ে বসে আমাকে। আমি তখন নতুন করে জানতে পারি, বউয়ের নাম শনতারা। শব্দের বাহনে চড়ে আমার যেন প্রত্যাবর্তন ঘটে শিকড়ে, যে শিকড়ে আটকে থাকে বহুগন্ধী কই মাছ।
এ তো গেল শব্দের কথা।
গল্প পড়া শেষ করে বিবশ অনুভূতিতে জড়িয়ে যেতে হয়। খলিলের নতুন বউ যখন নিখোঁজ হয়, পাঠক হিসেবে আমি সহসা ধরতে পারি না–কী হতে পারে তার পরিণতি। কিন্তু শেষে এসে যখন পড়ি–‘নিজের ঘরে দোর দিয়ে ঘুমুবার উদ্যোগ করে সে (খলিল)। কিন্তু খাটের দিকে এগোতেই ফের চমকে ওঠে। স্বল্পালোকেও সে চিনতে পারে–হালকা-ঘন বেগুনি আর হলদে ফোঁটা। কচুরিপানার ফুলের স্তূপ বিছানার চাদর প্রায় আড়াল করে ফেলেছে।’
এখানে এসে ধাঁধায় পড়ে থ হয়ে যাই। তবে কি এটা জলিলের কাজ? উত্তর মেলে না।
করুণ ক্যাসিনোর প্রায় সব গল্পেই পরাবাস্তবতার ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন পাপড়ি রহমান। তাঁর গল্পের যে মেজাজ, যে প্রেক্ষাপট, চরিত্র কিংবা কাহিনি; তার সঙ্গে পরাবাস্তবতার মিশেল–নিঃসন্দেহে অভিনব এবং জটিলও। স্বীকার করতেই হয়, এই কাজটা লেখক দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
‘ফাগুনবউ’ গল্পে আরেকবার ভাবনায় পড়ে যাবেন পাঠক। ‘সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে জুহীজির দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দেয় ভরত। আহা! ম্যালাদিন বাদে এক ফুল তাকে উন্মনা করেছিল–ফাগুনবউ! সারা শরীর জুড়ে হলদে রঙের মিছিল! যখন ফুল ফোটে গাছে কোনো পাতার চিহ্ন মাত্র থাকে না। এমন নয়নকাড়া পুষ্পকে একবার অন্তত স্পর্শ করা দরকার!
জুহীজি ইতস্তত করে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়।’
অভিনব! কী অসাধারণ পরিসমাপ্তি!
‘নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত’ গল্পে পাঠককে নিয়ে খেলা করেন পাপড়ি রহমান। মাহবুব, নদী, রুনি, বিড়াল–বিভিন্ন ধারায় ঘোরাতে ঘোরাতে নিবিষ্ট পাঠককে বলেন, ‘ওই অন্ধকার রাত্রি কখন যে ভোরের দরজা খুলে দেয়–আমি টের পাই না। বেশ বেলায় ঘুম ভাঙলে দেখি, রুনি তখনো মরে আছে। ফের বিকট শব্দ হয়। এবং আমার অতি কাছেই। আমি তাকিয়ে দেখি এক বিড়াল।’
এই ঘোরগ্রস্ততা কাটার আগেই পাঠক পড়ে যান ‘হলদে ফুলের বিকেল’-এর ঘোরে। ‘দুই হাত বাড়িয়ে সেই কঠিন বন্ধন খুলতে গেলে নয়নকে আরও তীব্র ভয় গ্রাস করে ফেলে। এমন হিম! এত শীতল কি তাকে বেড়ি পরিয়েছে? পুকুরের জলের কি এতটাই ক্ষমতা?’
লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে। বড় লেখা আজকালকার পাঠকেরা পড়েন না। আসলে হালের পাঠকের রুচি বোঝা মুশকিল। এটাও বলা মুশকিল–পাঠকের রুচি অনুযায়ী লেখক লিখবেন কি না।
দিন কয়েক আগে হরিশংকর জলদাসের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘পড়তে বসে আমি বইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। প্রবন্ধে কঠিন গদ্য চলে, কিন্তু গল্প-উপন্যাসে নয়।’
পাপড়ি রহমানের প্রসঙ্গেও কথা হলো। তাঁর ‘বয়ন’ উপন্যাসের উদাহরণ টেনে হরিশংকর জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত ভালো লিখেও পাপড়ি হালের পাঠক ধরতে পারছেন না কেন?’
আমি বললাম, পাপড়ি পাঠক ধরার লেখক নন। হরিশংকর হেসে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক। পাঠকেরা লেখক পাপড়িকে ঠিকই ধরে রাখবে।’
ছোটগল্পে ভাষার সাবলীলতা, গতিময়তা ব্যক্তিগতভাবে আমি পছন্দ করি। আগেই বলেছি, লুকানো টিকলির ফিনিক আমাকে বিভোর করে। তাই আমি মানিক-আবু ইসহাককে সময় নিয়ে পড়ি। কিন্তু খোলা টিকলির মাঝেও যে আটপৌরে মুগ্ধতা আছে, ইচ্ছে করলে পাপড়ি রহমান সেটাও ছড়াতে পারেন।

গল্পগ্রন্থ: করুণ ক্যাসিনো
লেখক:পাপড়ি রহমান
প্রচ্ছদ: রাজিব দত্ত
প্রকাশক: জলধি

মাইনুল এইচ সিরাজী
লেখক,শিক্ষক

Leave a Reply