জনসম্মুখে অপমান অপদস্ত করা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না/সালমা তালুকদার

জনসম্মুখে অপমান অপদস্ত করা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না/সালমা তালুকদার

সেদিন একটা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখলাম। একটা ছেলে আর মেয়ে একসাথে পাবলিক প্লেসে বসে সিগারেট খাচ্ছে। একটা সিগারেট…. হয়তো একটাই দুজনে মিলে খাচ্ছে। সেটা কথা না, কথা হচ্ছে সিগারেটটা মেয়েটার হাতে ছিল। এক টুপি ওয়ালা ভাইজান এসে মেয়েটাকে সরাসরি আক্রমন করে বসলো। পাশের ছেলেটা হতভম্ব। মেয়েটা তর্ক করতে চাইলো। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কারন এরমাঝেই ওখানে আরো লোক জমে গেল। এবং নানা রকম বাজে ইঙ্গিত। সাথে ভিডিও করা চলতে থাকলো। অবশেষে মেয়েটি সিগারেট নিভিয়ে উঠে গেল। আসেপাশের লোকজন তখনও বলেই চলেছে…এসব মেয়েদের কারনে অন্য মেয়েরা নষ্ট হয়…আরো অনেক কিছু। ওখানে অবশ্য কোনো নারীকে দেখা যায়নি। সব মুখ গুলো পুরুষের ছিল। তারা কেবলই পুরুষ। মানুষ নয়। মানুষের বিবেক থাকে।

হয়তো নারীরা আসেপাশেই ছিল। কিন্তু এগিয়ে আসেনি। যারা এগিয়ে আসেনি, কিন্তু এগিয়ে আসতে চেয়েছে। তাদের হয়তো এগিয়ে আসতে দেয়া হয়নি। হয়তো পাশে থাকা দূবল চিত্তের বান্ধবী এগিয়ে আসতে বারণ করেছে। অথবা প্রেমিক পুরুষ এগিয়ে আসতে দেয়নি। এতগুলো পুরুষ মিলে একজন নারীকে সবার সামনে লাঞ্চিত করলো। একটা মানুষও তাতে বাঁধা দিল না। সত্যি এমনি এমনি কি আর বলা হয় আমরা হুজুগে জাতি। ঐ ভদ্রলোক কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন জানি না। অথবা কার আক্রোশ কার উপরে চাপিয়েছেন জানি না। কেবল দেখলাম সংখ্যালঘুরা কি করে রাস্তাঘাটে অপমানিত হয়।

হয়তো অনেকে বলবেন আপনি মেয়েদের সিগারেট খাওয়া সমর্থন করছেন! হয়তো অনেকেই বলবেন একটা ইসলামি রাষ্ট্রে বসে আপনি এই কথা কেমন করে বলছেন। প্রথম কথা হচ্ছে, আমি শুধু মেয়েদের কেন, ছেলেদের সিগারেট খাওয়াও সমর্থন করি না। কারন সিগারেট নারী পুরুষ উভয়ের জন্য খারাপ। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, কোন দিক দিয়ে বাংলাদেশকে ইসলামি রাষ্ট্র মনে হচ্ছে? বাংলাদেশে বছরের সব কয়টা উৎসব পালন করা হয়। সেটা বাঙ্গালী সংস্কৃতি হোক আর বিদেশি সংস্কৃতি হোক। অথবা যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

বলবেন হয়তো,এর সাথে মেয়েদের সিগারেট খাওয়া টানছেন কেন! টানছি কারন এভাবে প্রকাশ্যে কোনো মানুষকে অপমান করার স্বাধীনতা থাকা উচিৎ নয়। যে লোকটি মাথায় টুপি নিয়ে এসে মেয়েটিকে অপমান করলো, আপনাদের মনে হয় না যে সে এটা বোঝাতে চেয়েছে মেয়েটি ইসলাম বিরোধী কাজ করছে বলে সে বাঁধা দিতে আসছে! আমার তো তাই মনে হয়। এটাকে বলে উগ্রতা। তিনি বোধহয় জানেন না, ইসলাম উগ্রতা পছন্দ করে না। ইসলামের আরো অনেক কিছুই হয়তো জানেন না। জানলে এভাবে উগ্র মূর্তি নিয়ে মেয়েটির সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। শুধু ঐ লোক কেন। কেউই কোনো খারাপ জিনিসের বিরুদ্ধে এভাবে প্রতিবাদ করতেন না। প্রতিবাদেরও কিন্তু একটা সুন্দর ভাষা আছে।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মে মানুষের সাথে মানুষের সহমর্মিতার কথা বলা হয়েছে। গীবত করতে নিষেধ করা হয়েছে। মেয়েদের যেমন পর্দার কথা বলা হয়েছে। তেমনি ছেলেদেরও কিন্তু পর্দার কথা আছে। এমন অনেক কিছু আছে যা মেনে চললে সমাজে সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হয়। ইসলামের ছায়া তলে এলে, মানুষ নিজের চিন্তা করেই তো কুল পাওয়ার কথা না। নিজের বেশভূষা, নিজের চরিত্র, নিজের নফসের সাথে যুদ্ধ। মোটকথা প্রতিনিয়ত নিজেকে সুদ্ধ করার চেষ্টায় ব্রত থাকার পর আর মানুষের পেছনে লাগার সময় থাকার কথা নয়।

নিজেকে সুদ্ধ করলে, নিজের আচরণের মাধ্যমেও কিন্তু সমাজ পরিবর্তন করা যায়। কি, যায় না? আর একটু খোলসা করি। একজন মানুষ যদি আপাদমস্তক ভালো মানুষ হয়, সে কিন্তু তার আশেপাশের কিছু মানুষকে পরিবর্তন করতে পারবে। নিজের চলন বলন কথা বলার ধরন, কথা দিয়ে কথা রাখা, মিথ্যা না বলা, মানুষের বিপদে সাহায্য করা, মনের মধ্যে কোনো হিংসা, অহংকার না রাখা, অহেতুক কোনো তর্কে না জড়ানো এগুলোই তো শিক্ষনীয় বিষয়। তাই না? এই বিষয়গুলো যার মধ্যে আছে লোকে তাকে ভয় পাবে। সমীহ করবে, বিশ্বাস করবে এবং সবশেষে তার কাছ থেকে কিছু শিখবে। অথচ এই বিষয়গুলো কতজন মানুষ বোঝে বলেন তো! বরং কে কাকে বিপদে ফেলবে, কার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাবে, রাস্তাঘাটে কিভাবে একজন আরেক জনকে অপমান করবে সেই চেষ্টা থাকে সর্বদা।

আমার একটা প্রশ্ন, প্রকাশ্যে একটা মেয়েকে অপমান করলো সবাই মিলে। কিন্তু লাল শাড়ি পরা আরেকটা মেয়ে যে প্রকাশ্যে সিগারেট খেয়ে ধোয়া ছাড়লো তাতে কেউ বাঁধা দিতে এলো না কেন! সবাইকে দেখা যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যপারটা রিতীমত উপভোগ করছে। কেন! মেয়েটি তো মনে হয় চাইছিল কেউ এসে প্রতিবাদ করুক। কেউ এগিয়ে এলো না কেন!

যাই হোক শেষ কথা বলি, রাস্তাঘাটে লাঞ্চিত করলে কোনো কিছু বন্ধ করা যায় না। আরো বিগড়ে যায়। উস্কানি মূলক প্রতিবাদ বলে এসবকে। বিশেষ করে সিগারেট খাওয়ার মত বিষয়কে কেন্দ্র করে এসব ঘটনার সূত্রপাত করা মানে হচ্ছে, নারীদের বুঝিয়ে দেয়া তুমি নারী তাই এসব করতে পারবা না। আজব! সিগারেট খাওয়া তো নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ক্ষতিকারক। তাহলে কেবল নারীকেই কেন আক্রমন করা হয়! চোখে দেখতে খারাপ লাগে শুধু সেই কারণে! এটা তো কোনো যুক্তি হতে পারে না। একটা ঠিকঠাক যুক্তি দ্বার করিয়ে বাঁধা দিতে আসলে ভালো হয়। এভাবে বাঁধা দেয়ার কারনে কিন্তু এই খারাপ ব্যাপার গুলো আরো ঘটবে। আরো বেশি করে নারীরা রাস্তায় সিগারেট খাবে। তখন কি হবে। যে ধোয়াটা নিজের চাইতে অন্যের ক্ষতি করে বেশি, সেই ধোয়াটা আরো বেশি করে উড়বে বাতাসে। সুতরাং অনুরোধ রইলো সেসব উগ্র পুরুষদের প্রতি যারা মেয়েদের প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া দেখলে ভেতরে জ্বলুনি শুরু হয়, যারা মেয়েদের কারনে অকারনে হেয় করতে উদগ্রীব থাকেন সর্বদা। দয়া করে নিজের আচরণ ঠিক করেন। দয়া করে উগ্রতা পরিহার করে নিয়ম মেনে সামাজিক ব্যধির প্রতিবাদ করুন।

মোদ্দা কথা নিজের আচরণ দিয়ে অন্যের আচরণ পরবর্তনের চেষ্টা করুন। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে ব্যক্তির নিজের আচরণের পরিবর্তন জরুরি। জোড় করে, বাজে কথা বলে অথবা জনসম্মুখে লাঞ্চিত অপমানিত করে কোনো সামাজিক ব্যধির চিকিৎসা করা যায় না।

সালমা তালুকদার
২০ ডিসেম্বর ২০২০ ইং

Leave a Reply