লায়লা মুন্নীর কবিতাগুচ্ছ

লায়লা মুন্নীর কবিতাগুচ্ছ

“অনাহূত”

এক অনাহূত পথচলা,
এক অনাহূত পথে আমার শব্দেরা হেঁটে যায়।
নিঃশব্দে হেঁটে যায়—-
প্রতিটি পদচিহ্নে কোন প্রমান থাকেনা।
কোন শব্দবাহুল্যতা নয়, কেবল হেঁটেচলা …..
এ অনাহূত পথচলায় প্রাণশক্তি পদদলিত হয়,
নাম পরিচয় গন্তব্যহীন এ পথচলায় সঙ্গী হয় কেবল একটি শব্দ,কেনো?
এ “কেনো” শব্দটিকে নিয়ে,
এক অনাহূত জীবন আমার।
এ জীবনে জীবনীশক্তি পদদলিত হয়,
আত্মা রক্তাক্ত হয় অপমানে, অপবাদে আর অপঘাতে।
আত্মার মৃত্যু হয় জীবনপথের উত্তপ্ত পীচে,
এ মৃত্যু কোন কলঙ্ক এঁকে যায় না গলিত পীচে।
এ যেনো এক মৃত্যুকূপে ঝলসানো জীবনের পথচলা,
নাম পরিচহীন গন্তব্যহীন এ পথচলায়
সঙ্গী হয় আবারও কেবল একটি শব্দ,” কেনো? “…..
এ’কেনো’ শব্দটি বাকহীন, নিরাকার, নিথর,
এ’কেনো’ শব্দটির যেনো কোন উত্তর থাকতে নেই।
এ’কেনো’ শব্দটিতে থাকে জড়া, থাকে অসারতা,
থাকে অশ্রু,থাকে কান্না, থাকে দীর্ঘশ্বাস।
অনাহূত এ শব্দটিই আমার রক্ত উত্তপ্ত করে,
বিপ্লবী করে আমার সত্তাকে,
এক অনাহূত বিপ্লবে ধাবিত হই আমি।
ঠিক যখন এই “কেনো” শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয় বার বার আমার মস্তিষ্কে,
ট্রিলিয়ন নিউরনে ওরা করে গগনবিধারী চিৎকার
আমাকে নিয়ে, আমার হয়ে আমার সাথে উচ্চারিত করে এক আজন্ম হাহাকার ….
আমার সাথেই কেনো?
আমাকেই কেনো?
আমিই কেনো?

“কবিতা ও কদম”

খুব একটা বৃষ্টি হোক,
কবিতাগুলো ধুয়ে যাক।
ধুয়ে যাক বিন্দু বিন্দু করে জমানো
গোপন কুঠুরির নিঃশব্দ কষ্ট গুলো।
খুব একটা ঝড় হোক
কদমফুল গুলো ঝরে যাক,
ঝরে যাক প্রথম কদম ফুলের
ভালোবাসার হলদে পাপড়িগুলো।
খুব একটা বর্ষা আসুক
কবিতা আর কদম ভেসে যাক,
বন্যার জলে ভেসে পৌছে যাক ওরা,
ভালোবাসার নতুন কোন মোহনায়।
যেখানে দিনের পর দিন কদর্য
কোন ভালোবাসার জন্য কাঁদতে হবে না,
কাজল কালো চোখের জলে ভেজা
কোন কবিতা ও কদমকে।

“অমরত্বের আড়াল”

তুমি এভাবে আড়াল হবে বুঝিনি,
আড়াল হওয়া হয়তো খুব সহজ তোমার কাছে।
যেমনি সহজ ছিলো আমায় তোমার ভালোবাসা,
যেমনি সহজ ছিলো আমার থেকে তোমার দূরে যাওয়া।
হয়তো তেমনি নিজের ধ্যনেই ডুবে গেছো সংসার সমুদ্র থেকে
খুব দূরে জীবনানন্দের নিরালা নীড়ে।
তোমার সে ধ্যনমগ্নতায় আমি হয়তো নেই,
আমার ছায়া নেই,
আমার ভাবনাগুচ্ছও নেই।
তবে কি আছে তোমার সে আড়ালে ?
কি পেতে চাইছো তুমি?
পেতে কি চাইছো অমরত্ব?
যে অমরত্বের টানে জগৎ সংসার ছেড়ে যায়
মধুকরেরা।
যে অমরত্মের টানে সংসার ত্যাগী হয়েছে,
কোন কালে সংসারী হওয়া কোন বিজন ঘরের পরবাসী।
তবে জেনে রেখো তোমার সাধনার সে অমরত্বের প্রাপ্তি,
তোমার হবে না সে ধ্যানে।
হবে না সে মগ্নতায়,
যুগে যুগে কোন প্রিয়তমার বাহুডোর এড়িয়ে কোন অমরত্ব পায়নি কোন সাধক,
পেতে পারে না।
তুমি হয়তো জানোনা, জানেনি তোমার সে ধ্যান, সে মগ্নতা,
জানেনি তোমার রক্তিম পূন্যবান হৃদয়,
তোমার সে বহুল কাঙ্খিত অমরত্ম লুকিয়ে আছে
আমার আগুন পোড়া মনের বিশ্বাসের অভিশপ্ত নিস্তব্ধতায়।

“আমার তুমি”

আমি হতে চাইবো একটি ভোর,একটি সোনালীরোদ্দুর,
সোনালী আভায় আলোকিত হবো আমি,
সাথে থাকবে সরব প্রকৃতি,আমার প্রকৃতি হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
আমি হতে চাইবো একটি মধ্যদুপুর,একটি তাপদাহ,
কঠিন তাপদাহে পুড়ে খাঁটি হবো আমি,
সাথে থাকবে গাছের ছায়া,আমার ছায়া হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
আমি হতে চাইবো একটি পড়ন্ত বিকেল,একটি গোধুলি,
গোধুলির রঙে রঙীন হবো আমি,
সাথে থাকবে ক্লান্ত পাখিরা, আমার পাখি হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
অতঃপর আমি হতে চাইবো ধ্রুবতারা,একটি নক্ষত্র,
আপন আলোয় আলোকিত হবো আমি,
সাথে থাকবে সপ্তর্ষিমণ্ডল,আমার সঙ্গী হবে তুমি।
তুমি হবে আমার তুমি।
কেবল আমি হতে চাইবো না মানুষ,কোন মানবী,
মানবীয় গুনাবলী অর্জন করবো না আমি,
সাথে থাকবে না আমার বিবেক,
আমার পাশে কখনোই থাকো না যে তুমি!
তুমি কি আমার তুমি?

“কোন একদিন আমার জন্য”

কোন একদিন খুব বৃষ্টি হয়েছিলো আমার জন্য,
কোন একদিন একটি কদম ফুটেছিলো আমার জন্য,
কোন একদিন একটি মিষ্টি বিকেল এসেছিলো
আমার জন্য।
কোন একদিন এক জোড়া স্বপ্নিল চোখ অপেক্ষায় ছিলো
আমার জন্য।
কোন একদিন একটি হৃদয় ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে
প্রতীক্ষায় ছিলো,আমার জন্য।
কোন একদিন স্বপ্নভরা চোখজোড়া তার ভালোবাসা পূর্ণ হৃদয়টি নিয়ে,
তার মিষ্টি অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলো
আমার জন্য।
চোখ জোড়ার সেই অব্যক্ত ভাষা,
সিক্ত হৃদয়ের সেই গভীর ভালোবাসা
আমি পরিমাপ করতে পেরেও
আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম ভেজা কদম ফুলটিকে,
ভালোবাসার ভেলায় ভেসে যাবার ভয়ে।
আমার সে ভেজা কদম চলে গেলো
তার সমস্ত অপেক্ষা ও প্রতীক্ষাগুলো নিয়ে আমার জন্য।
ঠিক সে মুহুর্ত থেকে
আমি অপেক্ষায় থাকি প্রতিটি মুহূর্তে
একটি ভেজা কদমের জন্য,
একটি বৃষ্টি দিনের জন্য,
এক জোড়া স্বপ্নময় চোখের জন্য,
একটি ভালোবাসা পূর্ণ হৃদয়ের জন্য।
ঠিক সে ক্ষণটি থেকে আমি প্রতীক্ষায় থাকি প্রতিটিক্ষণে
একটি বৃষ্টি ভেজা কদমের অব্যক্ত ভালোবাসাকে
জয় করে নেবো বলে।
কোন একদিনের অপেক্ষায় থাকি আমি হাজার দিন,
একটি প্রতীক্ষার অবসান হবে বলে আমার জন্য।

“একই ভিন্নতা”

একই আকাশ,তোমার মতো আজও তো আমার আছে
তবু কেন তোমার আকাশ,আমার থেকেও খুবই কাছে?
একই সবুজ,তোমার মতো আছে তো বেশ আমার পাশে
তবু কেন তোমার সবুজ,আমার চেয়েও সজীব সাজে?
একই দীঘি,তোমার মতো আমার চোখে কাজল পরে,
তবু কেন তোমার দীঘির, পদ্মপাতায় শিশির ঝরে?
একই রাতে পূর্নিমা চাঁদ,তোমার মতো আমায় জাগায়,
তবু কেন তোমার পূর্নিমাটা আমায় শুধু একাই কাঁদায়।
একই নীল,তোমার মতো আছে আমার নীলাম্বরে
তবু কেন তোমারই নীল আমায় ছাড়ে আড়ম্বরে।
একই সাগর,তোমার মতো আমার মনে জোয়ার আনে
তবু কেন তোমার সাগর, সুরটি তোলে অন্যখানে।
একই পথে,তুমি আমি হাঁটি যখন ইচ্ছে জাগে
তবু কেন পথটি শুধু,
আমার কাছেই ভিন্ন লাগে?

Leave a Reply