স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে আর নিজেকে ছোট করা নয় :: সালমা তালুকদার

স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে আর নিজেকে ছোট করা নয় :: সালমা তালুকদার

ছেলে মেয়ে দুই বিপরীত লিঙ্গ। এই দুই লিঙ্গের প্রতি পরস্পরের আকর্ষণ আছে সত্যি। তাই বলে একটি মেয়ে অথবা একটি ছেলে কয়জন বিপরীত লিঙ্গের সাথে জড়াতে পারে!
সমাজে বহু গামীতা আছে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও আছে। মেয়েদের ক্ষেত্রেও আছে। তাই বলে ঢালাও ভাবে যে কাউকে খারাপ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত! ভালো খারাপ মিলিয়েই তো মানুষ। এই কথাটাই সবাই ভুলে যায়। সেখানে ছেলেরা যেমন ভালো আছে। মেয়েরাও ভালো আছে। তবে কেন যেন ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের দিকে সমাজের আঙ্গুলটা একটু বেশিই উঁচিয়ে থাকে।
এখনো দেখি মেয়েরা ভয় পায়। কথা বলতে ভয় পায়। কারো সাথে মিশতে ভয় পায়। ছেলেদের সাথে ছবি তুলতে ভয় পায়। কারন ছবিটা দেখলে কেউ যদি অন্যকিছু ভেবে বসে! হয়তো একটি ছেলে একটি মেয়ে ছবি তুললো। ভালো বন্ধুত্ব থেকেই তুললো। খুব কাছের কেউই বলে বসলো কি সম্পর্ক তার সাথে তোমার!
কেয়ামতের আগ পর্যন্ত এই ধারনা পাল্টাবে না। দুনিয়ার সব মেয়েই যেন প্রস্টিটিউট! ব্যাপারটা এমন। আগে হিজাব পরলে মেয়েরা কথা থেকে বাঁচত। এখন সেখানেও বলে “ঘোমটার নিচে খেমটা নাচে।” হ্যা নাচে। আমিও বলি নাচে। কিন্তু সেটা সমাজ তাকে নাচতে বাধ্য করেছে। যখন চুল খুলে, ওড়না এক সাইডে দিয়ে রাস্তায় চলতো তখন সমাজ বলতো, ছিঃ কি বাজে! সব দেখিয়ে হাঁটছে। সেই মেয়েটাই যখন বোরখা অথবা হিজাব পরে কোনো ছেলের সাথে ছবি তোলে তখন বলে, ঘোমটার নিচে খেমটা নাচে।
ব্যাপারটা এমন, যাক বাজে কথা বলে হিজাব ধরিয়েছি। এবার হিজাব সহ ঘরে ঢুকতে বলি। আজীবন মেয়েদের বিরুদ্ধে এমন নষ্ট ষড়যন্ত্রই চলে এসেছে। অদূর ভবিষ্যতেও তাই চলবে। জানা কথা। আর এই সব থেকে বাঁচতে কিছু মেয়ে নারীবাদীর সঙ্গা না জেনেই নারী বাদী হয়ে যাচ্ছে। নারীবাদীতা মানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়া। ট্যাবু ভাঙ্গার জন্য মাসিকের প্যাডের ছবি তুলে আপলোড করা। অথবা প্রেমিকের বুকের ভেতর ঢুকে ছবি তুলে আপলোড করা। অথবা লেখার মধ্যে খিস্তি উচ্চারণ করা। এসবই নারীবাদী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করার একটা চেষ্টা।

আমি নারীবাদী বলতে বুঝি নারীর অধিকার নিয়ে লড়াই করা। অবলা নারীকে তার প্রাপ্য সমানটুকু আদায় করে দেয়া। সেটা ঘোমটা মাথায় দিয়েও হতে পারে। অথবা স্লিভলেস কামিজ পরেও হতে পারে। তাই বলে নিজের ব্যক্তিত্বের উপর প্রশ্ন উঠবে অথবা নিজের শরীর খারাপ হবে এমন কিছু সেবন করে নয়।
আচ্ছা প্রেম কি? একটি মনের সাথে আরেকটি মনের মিলন হলে তাকেই তো প্রেম বলে। প্রেমে মনের ভেতর ঝড় বয়ে চলে। একজন আরেকজনের অভাব অনুভব করে। তারপর সেটা ধীরে ধীরে শরীরের দিকে এগুতে থাকে। শারীরিক চাহিদা সবারই থাকে। কিন্তু সেখানে প্রেম থাকা লাগে। তা নইলে সব ছেলে অথবা মেয়েকেই তো গণহারে সেক্স কর্মী হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়।
এতকিছু বলার অর্থ হচ্ছে, সমাজের নোংরা চেহারাটা তুলে ধরা। এত যে উন্নতির জোয়ার বইছে চারপাশে, তবু মেয়েদের এখনো মাংসপিণ্ড হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। পতিতা পল্লীতে যারা অবস্থান করে। তারা বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আজ সেখানে অবস্থান করছে। যৌবনে যে পুরুষ একবার হলেও পল্লীতে গেছে সে যখন বয়স কালে আল্লাহর রাস্তায় যায় তখন পল্লীর বিরুদ্ধে কথা বলে। কারন তার সময় শেষ। আমার কাছে যে মধ্যবয়স্ক নারী ফোন দিয়ে বলে, জানো আমার বয়ফ্রেন্ড আমার চেয়ে বিশ বছরের ছোট। তবু আমার সাথে পারে না। সেই নারীকে আমি সুস্থ বলবো না। অসুস্থ বলবো। কারন সে তার এই গোপন কথাটা আমার মত অপরিচিত একজন নারীর কাছে বলছে। সে অসুস্থ কিন্তু তার একসময়ের বেপরোয়া জীবনের জন্য। হতে পারে সে স্বামী দ্বারা নির্যাতিত। আবার এটাও হতে পারে তার নিজের স্বভাবের কারনে হয়তো সে কোনো জীবন সঙ্গীর সাথে মিলেমিশে থাকতে পারেনি। কিন্তু সংসার না হলেও তার শারীরিক চাহিদা রয়ে গেছে। আর তাই নিজের এই চাহিদা মেটাতে সে আজ তার ছেলের বয়সী বয়ফ্রেন্ড জোগাড় করেছে। তাকে পতিতা বলতে পারি না। কারন সে একজনকে নিয়েই খুশি। আর এটা তার ব্যবসা নয়। এই ব্যাপারটা যখন সামাজিকভাবে জানাজানি হবে তখন হুলুস্থুল কান্ড ঘটে যাবে। অথচ যারা ঐ নারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে তাদের মধ্যেই হয়তো এমন অনেকে আছে যাদের দ্বারা তার ঘরের স্ত্রী নির্যাতিত। অথবা স্বামী নির্যাতিত। কিন্তু সেটা গোপন করে সামাজিকভাবে সে নিজেকে আজকে এখন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রমান করতে এসেছে। এই হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। এবং এমনটাই চলতে থাকবে। যতদিন না স্বশিক্ষিতের হার আনুপাতিক হারে বাড়বে।

বলছিলাম চোখের দেখায় একজন মেয়েকে সামাজিকভাবে হেয় করা প্রসঙ্গে। সেই জায়গায় ফিরে যাই। একজন মেয়ে হয়েছি বলেই মেয়েদের জায়গা থেকে এত কথা বলতে পারছি। লেখালেখির সুবাদে অনেকের সাথে পরিচয়। অনেকের কথা জানি। নিজেকেও চিনি। সেই জায়গা থেকে বলতে চাই নারী পুরুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে শুধুমাত্র নিজের মানসিক উন্নতির জন্য কাজ করা প্রয়োজন। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষের দোষ খুঁজে তাকে অন্যের কাছে হেয় করতে যাবে, তখন তার অবস্থান একটা সময় কোথায় যেতে পারে সেটা চিন্তা করলেও ভয় লাগে। একজন মানুষের ব্যাপারে পুরোটা না জেনে তার ব্যাপারে তো কথা বলাই উচিৎ নয়। সবচেয়ে বড় কথা অন্যের ব্যাপারে কথা বলতেই হবে কেন! ছোট এই জীবনে ব্যস্ত থাকার অনেক রকম উপকরন আছে। সময়ই তো পাওয়ার কথা নয়।
একটা ছোট সত্য ঘটনা বলতে চাই। আমার ছোট ভাইয়ের সাথে আজকে কথা হচ্ছিল। আমাদের পরিবারের একজন সদস্যের নাম উল্লেখ করে বললো, “আপা তুই কি ওনার ঘটনা সম্পর্কে জানিস?”
আমি বললাম, ” জানি না।”
তারপর শিবলীর বর্ণনা শুনে আমার শুধু আফসোস হলো সেই সব লোকের জন্য যারা এখনো নিজের কথা চিন্তা না করে কেবল অন্যকে নিয়ে সমালোচনা করে। ঘটনাটা বলছি,
আমাদের ঐ পারিবারিক আত্মীয়কে যদি অত্যাচারী বলা হয় কম বলা হবে না। তার আচরণে খুব কম মানুষই আছেন যে চোখের পানি ফেলেননি। তার কাজই ছিলো মানুষকে কষ্ট দেয়া। সেটা পচা খাবার দিয়ে হোক অথবা নোংরা কথা দিয়ে হোক। আমি তার সাথে কথা বলতাম না। কারন ছোটবেলা থেকে জেদি আমি। খারাপ মানুষ দু’চোখে দেখতে পারি না। কথা বললে তার সাথে আমার লেগে যাবে তাই কথা বলতাম না।
তার মৃত্যু সংবাদে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিলো না। তাই কোনো ঘটনাই আমি জানি না। আজকে শিবলীর কাছে বর্ণনা শুনলাম।
তাকে কবরে নামানোর আগে যারা তার লাশ নামাবে বলে কবরে নেমেছিলো তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, কবরে প্রচন্ড গরম ছিলো। দম আটকে যাওয়ার মত অবস্থা। কবরের উপরে ঠান্ডা শিতল। কিন্তু কবরের ভেতরে প্রচন্ড গরম। অস্থির লোক দু’জন কোনো রকমে লাশটাকে কবরে নামিয়ে উপরে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু তারা উপরে উঠে আসতে যতক্ষন। লাশটাকে কিন্তু খোলা কবরে আর দেখা যায়নি। যারা উপস্থিত ছিলেন তারা মুহূর্তের জন্য বাকহীন হয়ে গিয়েছিলেন। হুশ ফিরলে উপস্থিত একজন বললেন তারাতাড়ি মাটি ভরাট করে সরে আসেন সবাই।
এরকম ঘটনা কয়জন জানেন? জানেন কেউ? আমি জানতাম না। তবে একটা ঘটনা জানতাম। সেটা হচ্ছে আমার পরিবারের একজন নেক বান্দার কবর কোনো কারনে খোঁড়া হয়েছিলো। কবর দেয়ার প্রায় মাস খানেক পর কবর খোঁড়ার পরও আমাদের পরিবারের সেই নেক বান্দার মুখ খানি ঠিক তেমনই উজ্জল ছিলো।

তো যারা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করেন তারা কখনো অন্যের পেছনে লাগেন না। নিজের আমলনামা নিয়েই তো অস্থির হয়ে যাওয়ার কথা। অন্যের পেছনে লাগার সময় কোথায়! সৃষ্টিকর্তা, আমাদের প্রিয় নবী, কবর, জান্নাত, জাহান্নাম কথাগুলো তো মিথ্যে না। সত্যি। একদিন মরতে হবে এটাও সত্যি। তাই অন্যের পরিবারে আগুন লাগানোর মশলা না খুঁজে নিজের পরিবারের সবাইকে কি করে সুখী করা যায় সেই দিকে মনোযোগ দেয়া ভালো না? কে কার সাথে সম্পর্ক করলো। কার সাথে কে ছবি তুললো। কে কেমন জামা কাপড় পরলো। কার বউ কার সাথে চলে গেলো। কার জামাই বউ রেখে আরেকজনের সাথে সময় কাটালো। কার সন্তান এত ভালো স্টুডেন্ট হয়েও ফেল করলো। এতসব বাজে কাজ না করে নিজের কোন কাজ গুলো খারাপ সেগুলো বের করে ভালো করা উচিৎ নয় কি! দিনশেষে যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই না পারেন তাহলে আপনার মানব জন্ম বৃথা।

Leave a Reply