জ্ঞানের আলোয় মুক্তির বার্তা।

জ্ঞানের আলোয় মুক্তির বার্তা।

জগতের এই যে কর্মব্যস্ততা, মানব- সুখের জন্য এই যে শত আয়োজন, এই যে জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচার, সবার উদ্দেশ্য একটাই- জাতির প্রত্যেক মানুষকে ভদ্র, সৎ ও কর্মমুখী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। যার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে তিনিই তো  ভদ্র। মানবের কল্যাণে সত্য সাধন, বিনয় জীবনে এগোতে হবে সমাজের প্রতিটি স্তরে। যে জীবনে ভদ্রতার পরশ নাই সে যতই ধর্ম কাজ করুক না কেন তার মূল্য খুব কম । যে ব্যক্তি ধার্মিক বলে পরিচয় দেওয়ার অধিকার রাখে তার অন্তর বাহির ভদ্র, সুন্দর ও সত্য। মানব জীবনের সহানুভূতি একটা শ্রেষ্ঠ গুণ। যিনি ভদ্রলোক তার প্রাণ- সহানুভূতিতে ভরা থাকবেই। যে মানুষকে সহানুভূতি দেখাতে অভ্যস্ত নন তাকে ভদ্রলোক বলতে মন কুণ্ঠাবোধ করে।

মানুষের সাথে ব্যবহার যদি নির্মল ও মধুর না হয় তবে আমরা নিত্য যত রকমের কাজ‌ই সমাধান করি না কেন , জীবনে তা যদি অন্যায়ের কলঙ্ক হতে স্বতন্ত্র করে না রাখতে পারে তাহলে আমাদের ধর্ম পালন করা ঠিক হবে না । যে জীবন পাপ অন্যায় মিথ্যায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে তার ধর্ম কার্য করতে যাওয়াটা লোক দেখানো একটা ভণ্ডামি ছাড়া আর  কিছুই না। জীবনের প্রয়োজনীয় মঙ্গলময় কাজগুলিই তো একপ্রকার উপাসনা। আমরা দৈনন্দিন জীবনে কর্ম যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রার্থনা, নিজের আঙিনা তারপর কর্মস্থল সর্বোপরি চারপাশের মানুষগুলোর প্রতি আচার-আচরণ ও  সুন্দর ব্যবহার,ভালোবাসা- সহযোগিতার মাধ্যমে শুরু করতে পারি । যা সত্য সুন্দর তা-ই  মানব কল্যাণের জন্য।

শুধু মুখের কথার মধ্যে ভদ্রতা সীমাবদ্ধ নয়। ভদ্র ব্যক্তি সর্বদা সহৃদয় ও সহনশীল হয় । কাজে ই  আমরা  যদি সর্বদা কর্মে আচার-আচরণ ও ব্যবহারে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেই কারো কথার কোন মূল্য আমাদের কাছে হবেনা । সে মানুষ কখনো ভদ্র হতে পারে না তাকে মানুষ  বলা যায় না । যদি আমাদের অন্তরের মানুষটিকে মধুর স্মরণীয় করে তুলতে পারি তবেই  হবে সঠিক জীবন।
প্রথমত ভালো ব্যবহার সঠিক মানুষ হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। আমাদের প্রিয় নবী সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে এত মানুষকে সঠিক পথে এনেছিলেন তা কিসের বলে? তাঁর মনুষ্যত্ব ,তাঁর আদর্শ্য, তাঁর ভদ্রতা মানুষের মনকে মুগ্ধ করে দিত। হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর জীবনে তাঁর ভদ্রতা ছিল আশ্চর্য জিনিস। তাঁর স্নেহ, তাঁর সহণগুণ, তাঁর স্বভাবের অনন্ত মাধুরী মানুষকে পাগল করে দিতো। তার স্নেহ ভালবাসা সহনশীলতা পরক্ষমা সবকিছু মিলিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে দিত।
আজকের যুগে অর্থ মায়াজাল টা বড্ড বেড়ে গেল। অর্থের প্রতি এত মমতা আর তার প্রতি অন্ধ ভালোবাসা কাঁঠালের আঠার মতন লেপটে রয়েছে মানুষের মনের ভাবনায় আর  কর্মে। মানুষ আজ যেকোনভাবেই লাখ থেকে কোটি পতি কোটিপতি থেকে multi-billion হতে চায়। সবাই সবার জায়গা থেকে শীর্ষে উঠে পড়তে চায়। এ যেন এক মরণপণ প্রতিযোগিতা। আর তার জন্য নিজের সততা কে বিসর্জন দিতেও কুন্ঠা নেই। কাকে মেরে কে চন্দ্রশেখর উঠবে সেই প্রতিযোগিতার সারাক্ষণ মত্ত। ঢাকা ভগ্নি থেকে শুরু করে প্রতিবেশী তারপর সমাজের উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে রাজতন্ত্রের সর্বস্তর পর্যন্ত চলে এ প্রতিযোগিতার খেলা। চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে চলে খেলা । পেতেই হবে এ নেশা যেন সর্বক্ষণ তাড়া করে ফেরে।  কিন্তু ভুলে যাই জাগতিক ঐশ্বর্য মানুষকে সাময়িক সুখ দিলেও শান্তি দেয় না। ” ধর্ম মানুষের আশ্রয়, মানুষের বিশ্বাস” এই কথা আমরা সর্বক্ষণ ভুলে থাকি। মনের ব্যাপ্তি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে, তাই মন অসীম। এখানে দ্বিমত করার দুঃসাহস কার ই বা আছে।

পাওয়ার, পজিশন, প্রেস্টিজ ( Power, Position & Prestige) এই তিন পি( P ) এর পিছনে ছুটে আসল spece কে মানুষ ভুলে থাকে। সমুদ্রের শতশত ঢেউ যেমন আছড়ে পরে,পরক্ষণেই আবার নতুন দিনের সূচনা করে । মনের এক‌ই অবস্থা, যে মানুষ হয় সে আপনিতেই মানুষ হয়। কিছু ফর্মুলা পথ দেখায় মাত্র। চলার গতি ধারা ও এক‌, যে যেই পথে গমন করবে তার গন্তব্য সেখানেই মিলবে।এটাই নিয়তির নিয়ম এটাই বাস্তবতা। একদিন মহাভারতের বিশাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিল – ” অর্জুন সাফল্য-ব্যর্থতার সমানভাবে নাও । হারলে হতাশ হয়োনা আর জিতলে অহংকার করো না। সঠিক কর্ম করাটাই আমাদের উপাসনা । তাই হার জিৎ কে সমানভাবে ভাগ করে  নিলে আমরা কষ্ট পাবো না”।

জীবন চলার পথে অর্থের প্রয়োজন আছে,ছিল, এবং তা যুগে যুগে থাকবে ও। কিন্তু যে অর্থ অন্যায় পথে অন্যকে দু’পায়ে মাড়িয়ে অর্জিত হয় তা কোন মানবজাতির কল্যাণে আসে না। ক্ষণিক সুখের জন্য অন্যায় পথ অবলম্বন করে। কিংবা ক্যাসিনো আস্বাদনে গা ভাসিয়ে অঢেল টাকা পয়সা কখনো মনুষ্যত্ব হতে পারেনা ।  সমাজ-রাষ্ট্রের অধিকার কুক্ষিগত করে জনসাধারনের অর্থ মেরে যে টাকার পাহাড় গড়ে তা স্বয়ং স্রষ্টা একদিন ধুলোয় লুটিয়ে দেন।বঞ্চিতের হাহাকার দু’ চোখের লোনা জলের ফোটা মাটিতে গড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে স্রষ্টার কাছে বঞ্চিতের ফরিয়াদ পৌঁছে যায়। সঠিক বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি তো স্রষ্টা আর সমস্ত কিছু তার হাতে ন্যস্ত থাকে তিনি করেন ও বটে । শুধুমাত্র সময় যাপনের খেলা মাত্র।

জীবনের অপমান হয় দুটি জিনিসে- প্রথমত অজ্ঞতায় দ্বিতীয়তঃ পরনির্ভরশীলতায়। অজ্ঞতার ন্যায় মহাশত্রু মানব জীবনে আর কিছু নেই। জীবনে যে অবস্থাতে থাকি না কেন জ্ঞানের সঙ্গে যোগ রাখতে হবে মানুষকে ভালো মন্দ বলে দেওয়া তাঁর আত্মার দৃষ্টি খুলে দেয়া তার জীবনের কলঙ্ক কালিমা গুলো কেঁদে ধুয়ে ফেলা। দাম্ভিকতা ও অর্থ প্রভাব মানুষের মনুষ্যত্বকে খর্ব করে দেয়। মনুষ্যত্ব লাভের পথ-জ্ঞানের সেবা,জীবনের সকল অবস্থায়, সকল সময়ে, আহার স্নানের মত মানুষের পক্ষে জ্ঞানের সেবা করা ও প্রয়োজন। জাতিকে শক্তিশালী শ্রেষ্ঠ ধন-সম্পদশালী  উন্নত করতে শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার বিকল্প নেই।

উন্নত বিশ্বের মানুষগুলো এখন প্রতিনিয়ত চাঁদে বসবাসের জন্য দুর্বার বাসনা নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। একসময় যা স্বপ্নের মতো ছিল। আর আমাদের দেশের মানুষগুলো একটা সময় ছিল এক বেলা অর্ধাহারে কাটলেও বাকি বেলা অনাহারে কেটে যেত । কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকতার ছোঁয়া, কর্ম সংস্থান আর মানুষের কর্মকান্ডে এখন তা আগের মত নেই। আমরা ও কর্মদক্ষতায় মননশীল হয়ে দারিদ্রতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে নতুনত্বের স্বপ্নে বিভোর হ‌য়ে পড়ি। আর  তা কোন অন্যায় ও নয়, যদি সেটা হয় সত্য ও ন্যায়ের মধ্যে কর্ম আর প্রার্থনায়। প্রত্যেকের সামর্থ্য আছে আর তা দিয়েই সমাজ আর মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই তো মানুষের মুক্তি। জীবনে মানুষ কে কাজ করতে হবে আর কাজের মাধ্যমে মানব জীবনের সুখ ও কল্যাণ নিহিত। সাধনা পরিশ্রমের সঙ্গে যদি জ্ঞান থাকে যে জ্ঞান মঙ্গলের তরে সুন্দরতার প্রতীক হয়ে আসে, যে জ্ঞান মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়, যে জ্ঞান পরোপকারী ও কল্যাণকর হয় যে জ্ঞান সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনায় সর্বদা উন্মুক্ত থাকে  যা গোটা মানব জাতির জন্য কল্যাণকর ইহকাল ও পরকালের জন্য।

মানুষের জীবনে যতই দুঃখ বেদনা থাকনা কেন আনন্দ সঙ্গে তা বরণ করে নিতে হবে। মুখের হাসি,চিত্তের ফুর্তি সকল বিপদ আপদ দূর করে দেয় । জীবন আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়েছে  আল্লাহর নামে কেবল হাসতে থাকুন ওই মেঘ উড়ে যাবে। আনন্দহীন জীবনের ভার বহন করার মত দুরবস্থা মানব জীবনের আছে কি? ব্যবসায় ক্ষতি, ঋণভারে মাথা নত, মানুষের কড়া কথা শুনে মন অস্থির, সমস্ত সম্পত্তি হাত থেকে বেরিয়ে গেছে এসব ভেবে কাঁদলে চলবে না। সমস্ত ভুল গুলোকে নিজের মতো করে স্বীকার করে নেওয়া এবং বাস্তবিক দীনহীন্যতার অবস্থাকে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে উপরওয়ালার প্রতি আস্থা রাখা উচিত। তিনি স্রষ্টা তিনিই কেবল পারেন একমাত্র সমস্ত বিপদের সমাধান আর মীমাংসা করতে। মানুষের পাপ মানবসমাজকে মৃত্যুর পথে টেনে নিয়ে যায়। পাপী শুধু নিজেই পাপ‌ করে না তার অত্যাচারে আঘাত সহ্য করতে যেয়ে মানব সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় । যে মানুষের চোখ থেকে রক্ত টেনে বের করে মানবহৃদয়ের চিতার আগুন জ্বেলে দেয় , সে জীবন্ত অভিশাপ হয়ে জগতে বাস করে । সে নিজের বুকে ছুরিকাঘাত করে অথচ সে বুঝতে পারে না সে কি করছে।

যতকাল মানুষ বেঁচে থাকে, ততকাল যেন কোন অন্যায় না করে। জীবনে যে মহৎ মনুষ্যত্বের পরিচয় দেয় সেটুকুই যেন মৃত্যুকালে পাওয়া যায়, তবেই যথার্থ আনন্দ আনবে জীবনে। যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ পাপ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যেতে হবে। যথাসাধ্য মানুষের তরে সুখ দুঃখ কষ্ট মোচন করার চেষ্টা করতে হবে, তারপর মৃত্যু দ্বারা আমাদের মুক্তি হবে। যে জাতি সময়ের মর্যাদা জানে কাজের মূল্যায়ন বুঝে শ্রম এর মধ্য দিয়ে সে জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল সেটা সর্বত্র। জ্ঞান তপস্যায় সত্য পালনের মধ্য দিয়ে অন্তত মানুষকে শ্রদ্ধা করে হাসিও গানের আনন্দে জীবনে অগ্রসর হয়ে হিংসা,পরশ্রীকাতরতা,অহংকার মন থেকে দূর করে দিতে হবে। মানুষের বুকের সঙ্গে বুক লাগিয়ে সত্য ন্যায়ের প্রেম পুণ্যের  গান গেয়ে যেতে হবে। তবেই সঠিক মনুষ্যত্ব আর পূর্ণতা পাওয়া যাবে ।

আত্ম উপলব্ধির জায়গা থেকে
খোরশেদ আলম বিপ্লব।
লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply