বৈঠক ৫ :: টনি মরিসনের সাহিত্য

বৈঠক ৫ :: টনি মরিসনের সাহিত্য

তিনি একজন নারী হয়ে উঠছেন একটি ইস্পাত কারখানার পাশে। ছোট্ট একটা ঘর। সে ঘরে কাঁচা রঙের তীব্র গন্ধ প্রতি মুহূর্তে বের হয়ে যেতে ধমকি দিচ্ছে। তাঁর মতো মেয়ের জীবন নিয়ে কোনো বই লেখা হয়েছে কি? তেমন কোনো বই তাঁর হাতে পড়েনি। সিদ্ধান্ত নিলেন সেই গল্প তিনিই লিখবেন। লিখলেন এবং উপন্যাসের নাম দিলেন ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের জীবন উঠে এসেছিল যার লেখায় তিনি টনি মরিসন। নোবেলবিজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমেরিটাস। তিনি ৫ অগাস্ট, ২০১৯ মৃত্যুবরণ করেন।

গত ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ এ টনি মরিসনকে স্মরণ করে কালির বৈঠক-৫ এর আয়োজন ছিল ‘টনি মরিসনের সাহিত্য’। টনি মরিসনের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক, লেখক এবং অনুবাদক নুরুল করিম নাসিম, অধ্যাপক ও অনুবাদক দুলাল আল মনসুর, সিনিয়ার লেকচারার আফরোজা আকতার টিনা।

বিশ্বসাহিত্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নুরুল করিম নাসিম তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। অন্য ভাষার কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকের কি দরকার আছে আমাদের? বাংলা সাহিত্য ও বিশ্ব সাহিত্যের তুলনামূলক পাঠ থেকে বেরিয়ে আসে এই উত্তর। আমরা জানতে পারি বাংলা সাহিত্য এখন কোন জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কী করছি এবং কী করতে হবে। আমারিকান সমাজের শ্রেণিবৈষম্য আর শ্রেণি সংগ্রাম টনি মরিসন তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন। তিনি সমাজকে ভেতর থেকে দেখেছেন। এভাবে আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ঔপন্যাসিক সমাজকে দেখেননি। আফ্রিকান অনেক লেখক আছেন। যাদের উপন্যাস বিশ্ববিখ্যাত। যেমন দ্যা ডিস্প্লেসড। রুটস এর লেখক এলেক্স হেলি। তাঁর উপন্যাসেও নিপীড়িত কালোদের পেয়েছি। কালোদের কোনো কন্ঠ ছিল না। আচিবিও কালোদের নিয়ে লিখেছেন। সাদা মানুষের অঙ্গনে কালো লেখকদের প্রতিষ্ঠা পাওয়া খুবই কঠিন কাজ ছিল। এই কাজটি সুচারুভাবে টনি মরিসন করতে পেরেছিলেন। এর অন্যতম কারণ তাঁর ভাষা। খুব সহজ সরল। ছোট ছোট লিরিক্যাল বাক্য। অনেকটা আমাদের জহির রায়হানের গদ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারি।

আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ্য, টনি মরিসনের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লিখেননি। বর্ণবাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন। বর্ণবাদ অ্যামেরিকান সমাজের কী ক্ষতিগুলো করেছে সেটা ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্ণবাদের সমস্যা সেই সময় উত্তুঙ্গে ছিল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা ব্লুয়েস্ট আই’ তে তিনি তাঁর যে সমাজ, সময়, পরিজন, বন্ধুবান্ধব এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন। এই বইটি তাঁর প্রথম বই এবং এই বইটি আন্ত্ররজাতিক পুরস্কার পায়। বোবেল পুরস্কার। সাহিত্যের ইতিহাসে এমন দেখা যায় না। তিনি প্রথম এবং একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এক ইন্টার ভিউতে টনি মরিসন বলেছেন যে তিনি শুধু তাঁর সমাজের কথাই লিখেননি, আমেরিকার সমাজের কথাও লিখেছি। সাদা মানুষের কথা আনরিকতা ও অন্তরঙ্গতার সাথে নিরপেক্ষভাবে লিখেছি। এই কঠিন কাজটি তিনি সার্থকভাবে করতে পেরেছিলেন।

টনি মরিসনের জীবনটাই যেন উপন্যাস। চল্লিশের দশকে জন্মগ্রহ্ণ করেন। টনি মরিসন খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করেছেন এবং কষ্ট করেই জীবনযাপন করেছেন। জ্যামাইকান এক কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে তিনি পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। শেই বিয়ে টিকেনি। এর পর তিনি ভাবলেন তাঁকে বাঁচতে হবে উঠে দাড়াতে হবে। তিনি চাকরি শুরু করলেন। চাকরিতেও যখন হচ্ছে না, শুরু করলেন লেখালেখি। তিনটি সন্তানকে গ্রীষ্মকালে তাঁর মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। এই সময়টিতে তিনি লেখালেখি করতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে দ্যা ব্লুয়েস্ট আই, দ্যা বিলাভেড, দ্যা সুইট বয়, জাজ। তিনি ঔপন্যাসিক এবং সম্পাদক হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন।

টনি মরিসনের উপন্যাসগুলো অনিবার্য উল্লেখ করে নুরুল করিম নাসিম বলেন- একবিংশ শতাব্দীতে ডিপ্লোমেসির কারণে যে বিভক্তি আমরা দেখতে পাই টনি মরিসন সেই ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর উপন্যাস রাজনৈতিক উপন্যাস নয়। তাঁর উপন্যাস জীবনমুখী উপন্যাস। নুরুল করিম নাসিম বলেন বিশ্ব সাহিত্য যেমন আমাদের পড়া হয় না। জানলাগুলো আমরা বন্ধ করে রেখেছি। ভালো ইংরেজি অনুবাদের অভাবে বিদেশিরাও আমাদের সাহিত্য পড়তে পারে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে উদয়োগ নিতে হবে।

অনুবাদক দুলাল আল মনসুর বলেন- ৫০ এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ লেখক টনি মরিসন দেখলেন তখন তিন ধরনের লেখক লিখছেন। শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, শ্বেতাঙ্গ নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। নিজের জগতের নিজের কথা বলার জন্য এলেন টনি মরিসন। টনি মরিসনকে অনেকেই নারীবাদী লেখক বলার চেষ্টা করেছেন। বেঁচে থাকতেই তিনি এগুলো খণ্ডণ করেছেন। শুধু নারীদের কথাই তিনি বলেননি। পুরুষের কথাও আছে। সে সমাজের কথা তিনি বলেন, সে সমাজের পুরো চিত্রটাই তিনি তুলে ধরেছেন। সেই সময়ে যাদের কথা তিনি বলছেন তাঁরা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে। তাঁর আগে এত ভালোভাবে কেউ কথাগুলো বলেনি।

ছকে বাঁধা উপন্যাস তিনি লিখেননি। একেকটি উপন্যাসের নিজস্বতা একেক রকম। প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। যদি সমাজের শোস্নের কথা বলি, তাঁর প্রথম উপন্যাসেই শোষনের কয়েকটি স্তর আছে। শ্বেতাঙ্গরা শোষণ করছে কৃষ্ণাঙ্গদের আবার কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষেরা শোষণ করছে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের আর শিশুদের। কিছু উপন্যাসে নারী চরিত্ররা শক্তিশালী। সংকীর্ণমনা নিষ্ঠুর কিছু নারী চরিত্রও আছে। প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা ব্লুয়েস্ট আই’তে পিকোলা’র মায়ের মধ্যে মায়া মমতা কম দেখা যায়।

আফরোজা আকতার টিনা মরিসনের ব্লুয়েস্ট আই উপন্যাসকে অ্যামেরিকার তৎকালীন সমাজের একটা প্রতিস্থাপন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রেসিজম, হেজিমোনিক ডমিন্যান্স, কালচারাল ডমিনেন্সকে তিনি ব্লুয়েস্ট আই উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মনে করেন। আলোচনায় তিনি মূলত নিয়ে। আলোচনা করতে গিয়ে ‘কন্সেপ্ট অফ বিউটি’ এবং সাইকোএন্যালিসিস নিয়ে বলেছেন।

টনি মরিসনের সাহিত্য থেকে অংশ বিশেষ পাঠ করেছেন-  সাদিয়া জাফরিন এবং ফারজানা ইয়াসমীন।

বৈঠক-৫ সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ইশরাত তানিয়া।

বিশ্ব সাহিত্যের এক একটি দুয়ার উন্মোচন মানে জাতীয় সাহিত্যের সমৃদ্ধি। আলোচনায় টনি মরিসনের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ তাঁর গদ্যে মানবিকতা, সম্মোহনী বর্ণনাশৈলীসহ অন্যান্য শিল্পচিহ্নগুলো পরিস্ফুট হয়েছে। সেই নিরিখে বলা যায় টনি মরিসনের সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে মানবচিন্তা, শিল্পকুশলতা, বৌদ্ধিকবিস্তৃতিতে আরও অর্থবহ এবং সম্প্রসারিত করবে।

 

Leave a Reply