একটি ঘটনা ও তার পরম্পরা :: শামসুল কিবরিয়া

একটি ঘটনা ও তার পরম্পরা :: শামসুল কিবরিয়া

আকাশে ভাসছে মেঘদল। বৃষ্টি হবে হয়তো। না-ও হতে পারে; ভেসে যেতে পারে হাওয়ার তোড়ে। এ অঞ্চল সিক্ত না-ও হতে পারে জলস্রোতে। কিন্তু বৃষ্টি নামে কোথাও। একফোঁটা, দুইফোঁটা করে অনেক ফোঁটা। সে অশ্রু বৃষ্টি। কখনো শব্দহীন কখনোবা ফোঁপানো কান্না আসে রিতার। সে কান্নার গভীরতা অনুভব করে কে-বা? এ জনপদের কে বোঝে তার কান্নার অসম্ভব যন্ত্রণা? অসহনীয় ব্যাথা? রিতা এসব ভাবেনা বা ভাবতে পারেনা। নতুন কিছু আর এ মাথায়  ঢুকেনা যেন। এখানে যা আগে ছিলো তা-ও যেন উবে গেছে। নিজের মাথাটা তাই শূন্য, ফাঁপা মনে হয় । শুধু  একটি জিনিস তার মাথাকে, তার মনকে ভার করে রাখে দিনে, রাতে, জাগরণে এমনকি হয়তো ঘুমেও। সেটা সেই স্মৃতি,সেই ভয়ংকর দুপুরের স্মৃতি। সেদিন সমস্ত আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়েছিলো তার মাথায়। তার চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো যেন। সে হারিয়ে গিয়েছিলো যেন নিজের কাছ থেকেই। সে স্মৃতি ধূসর হয়না কোনভাবেই। হালকা মেঘের মতো ভেসে চলে যায়না দূরে। সে স্মৃতি লেগে থাকে মনের এখানে-ওখানে, সবখানে।

এখন এই বিকেল বেলায় রিতা বাসার ভেতর বসে আছে নিশ্চুপ হয়ে। সেই দুপুরের পর থেকে  মূহুর্তগুলো এভাবেই কাটে। তার চাওয়া ও যে তা-ই। নইলে অন্তত এখন বান্ধবীদের সাথে ফোনে কথা বলা যেতো। কিন্তু ইচ্ছে হয়না। সেদিনের পর থেকে ফোনে আর কথা বলেনা সে কারো সাথেই না। অনেক জরুরী হলেও না। কেন কথা বলা? কথা বলা মানেই তো অপর প্রান্ত থেকে সান্ত্বনা পাওয়া,সহমর্মিতা পাওয়া আর এর ফলে যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হওয়া।

সেই উন্মাদ দুপুরের পর থেকে অনেককিছুই বিস্বাদ লাগে। পড়াশুনা,টিভি দেখা,গান শুনা আরো অনেক কিছু যা ভালো লাগার ছিলো, যা মনকে ভরিয়ে রাখতো আনন্দে ,জীবনকে করে তুলতো উপভোগ্য। এখন দূরের যেন সেসব অনেক দূরের। এখন সে বন্দী আপন কোটরে, আপন কুঠুরিতে। এখন সে আকাশ দেখে বাসায় বসে, রোদের খেলা দেখে বাসায় বসে। এখন সে গুনগুন করে গান গায়না। এখন সে জোরে জোরে হাসেনা।, যে হাসির জন্য মা প্রায়ই বকতো। ‘এতো হাসিস কেন? এতো হাসি ভালানা’ মা বলতো। মা এখন আর একথা বলেনা। কারণ সে এভাবে হাসেনা। মা-ও তো হাসতো। বাবাও তো হাসতো। কোথায় তাদের হাসি এখন? কোথায় লুকিয়ে গেলো? রিতা আহত বোধ করে নিজের জন্য তেমন নয় যেমন মার জন্য, যেমন বাবার জন্য। দুপুরটা, সেই ভয়ংকর দুপুরটা এলোমেলো করে দিয়েছে সবকিছু। তছনছ করে দিয়েছে স্বপ্নগুলো। সেই দুপুরের নিস্তব্ধতা,সেই দুপুরের ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ,হাহাকার আর চিৎকার মলিন হয়না কোনভাবেই।

রিতা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। স্কুল জীবনের গন্ডি পেরিয়ে ভিন্নরকম পরিবেশে এসে মন আনন্দে নেচে উঠেছিলো কেননা আগের চেয়ে নিজেকে অনেকটা মুক্ত মনে হয়েছিলো। স্কুলে যে কঠিন নিয়মের মধ্যে চলতে হতো, এখানে নিয়ম থাকলেও স্কুলের মতো নয়। এখানে দম ফেলার সুযোগ পাওয়া যায়। এখানে কিছু কিছু ইচ্ছের বাস্তবায়ন ঘটানো যায়। এখানে তাই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। এখানে এসে তাই চিন্তারা ডানা মেলে।এ খানে এসে তাই নতুন উদ্যম জাগে। নিজেকে চেনা হয় নতুন করে। রিতা ও তার বান্ধবীদের কথাবার্তা নতুন মাত্রা পায়। তাদের কথাবার্তায় নতুন নতুন বিষয় যোগ হয়।। তারা কৈশোরিক কথাবার্তাকে পেছনের বিষয় বলে মনে করে। নতুন পরিবেশ তাদেরকে আগের চেয়ে অনেক সৌন্দর্য সচেতন করে। তাই তারা উপজেলা সদরের বিউটি পার্লারে যায় মাঝে মাঝে। তারা এখন শারীরিক বিষয়াদি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি শেয়ার করে পরস্পরের সাথে কারণ তাদের জড়তা আগের চেয়ে কমে এসেছে। তারা ক্লাসের ফাঁকে মাঠে বসে গল্প করে। গল্পগুলো চলতে চলতে অনেক গভীরে প্রবেশ করে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে তারপর রাত নেমে আসবে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেলেই। আাঁধার নামবে তখন। সে আঁধার ঘন হবে রাত বাড়তে বাড়তে। আঁধারের পটভূমিতে রচিত হবে অনেককিছু। রিতা হয়তো পূর্ণাঙ্গ আঁধার দেখবেনা। কেননা বাসার ভেতর থাকে আলোকিত। রাস্তা থাকে আলোকিত। তাই এখানে নিরেট আঁধার আসেনা। ছোপ ছোপ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে থাকে। কিন্তু  রিতা আঁধারের কালো অনুভব করে। তার অনুভূতিতে এটা সর্বক্ষণই লেগে থাকে যেন। এ আঁধার অমোছনীয় যেন। এ আঁধার দূর করার জন্য কোন সূর্য উঠবেনা। এ আঁধার দূর করার জন্য কোন লাইট জ্বলবেনা। এ আঁধার ভীতি জাগানিয়া। এ আঁধার সত্তাকে নাড়িয়ে দেয় যেন। রিতা ভয় পায় এ আঁধারের অনুভবে। দিনে দিনে ভয় গাঢ় হয়। ভয় বিস্তৃত হয়। এ ভয় তাকে মূহ্যমান করে। যে প্রদীপ্তি এসেছিলো মনে তা ম্লান হয়ে এসেছে যেন। দিন গড়ানোর সাথে সাথে এক ফ্যাকাশে আস্তরণ পড়ে চেহারায়। এ থেকে কি কেউ কোন পাঠ নিতে পারে? হয়তো পারে । হয়তো পারেনা।

অতীতে ফেলে আসা অনেক দুপুরের মতো সেদিনও দুপুর নেমে এসেছিলো খাঁ খাঁ করে।এ দুপুর বিস্তৃত হয়েছিলো সদরে, কলেজের  আঙ্গিনায়, রাস্তায়,মাঠে সবখানে। রৌদ্র ঝলমল এই দুপুরে বাড়ি আসার কথা ছিলো রিতার, বান্ধবী সমেত, গল্পসহকারে। এভাবেই তো হেঁটে এসেছে অনেকদিন। অনেকগুলো মূহুর্ত মাড়িয়ে,ও রাস্তার পাশে থাকা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে ফিরেছে বাসায়। রিকশা নেয়া যেতো, ছিলোও গেটে দাঁড়িয়ে কয়েকটা, অনেক খালি রিকশা যাচ্ছিলোও তবু তারা অন্য অনেক দিনের মতো সেদিনও হেঁটে আসে সময় ‍দ্রুত না ফুরনোর জন্য। রিতা এখন আফসোস করে কেন সে রিকশা নেয়নি।হয়তো তাহলে দুপুরটা এমন ভয়ংকর হয়ে আসতো না তার কাছে। এমন গ্লানি নিয়ে আসতো না তার কাছে। কখনো আবার মনে একথা আসে যে, কেন সেদিন আরো ক্লাস হলোনা? হলেই বা কী হতো? তাকে তো ফিরতেই হতো বাসায়। একটু পরে হলেও আসতে হতো আপন গৃহে। রিকশায় আসলেই বা কি হতো রেহাই মিলতো? এভাবে ভাবলে আবার আফসোস  হয়না। তবু মন ভার হয়ে থাকে। কি যে হয়েছিলো সেদিন!

এক হিংস্র থাবা এগিয়ে এসেছিলো তার দিকে। এক থাবায় বন্দী করে ফেলে তাকে। কি যে জোর ছিলো পশুটার গায়ে! তাকে একটানে উঠিয়ে ফেলে  সিএনজি অটোরিক্সায় কিছু বুঝে উঠার আগেই। তারপর এটি দ্রত এগিয়ে চলে কলেজ ছাড়িয়ে দূরে, এক ছায়াচ্ছন্ন্ সবুজের আড়ালে।

নির্জনতা ব্যাপৃত ছিলো চতুর্দিকে। এটি ভাঙ্গার কোন যো নেই যেন। রিতাকে বহনকারী সিএনজি অটোরিক্সাটি এ নির্জনতার ভেতর ফোঁস করে ঢোকে পরে। এক অচেনা, অজানা পরিবেশ রিতাকে আরো ভীত আরো আতংকিত করে। সে চায় জোরে একটি চিৎকার দিতে। কিন্তু পারেনা। এখানে আসতে আসতে গলা শুকিয়ে এসেছে। শক্তির আর অবশেষ নেই যেন। এ অবস্থায় যদি চিৎকার দেয়ও তাহলে কি তা গাঢ় নির্জনতাকে ঠেলে কারো কাছে পৌঁছাতে পারবে? হয়তো পারবে না। হারিয়ে যাবে গাছের ফাঁক দিয়ে,  পাতার ফাঁক দিয়ে।‘যদি তাই হতো,আমিও যদি হারিয়ে যেতে পারতাম শূন্যে, তবে কতইনা ভালো হতো’ -ভাবে রিতা। কিন্তু তা হবার নয়, তা যে হবেনা কখনো। ভাবনারাও আর ডালপালা মেলতে পারেনা। তাকে থামিয়ে দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে যে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে সে। মুখের কাপড় খুলে কাছে এলে তাকে রিতার খুব চেনা লাগে, খুব পরিচিত লাগে। কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে সবসময়। সে এখন তার সামনে দানবাকৃতি হয়ে দন্ডায়মান। একেবারে কাছে এসে ধমক দিয়ে বলে‘চুপচাপ শুইয়্যা পড়। জোরাজুরি করলে ভালা অইতো না।’

-আমার এত বড় ক্ষতি কইর না শফিক ভাই।

-কথা কম।টাইম নাই।তাড়াতাড়ি শুইয়্যা পড়। নাইলে…

কথা শেষ না করেই উত্থিত শিশ্ন সমেত রিতাকে জড়িয়ে ধরে টান মেরে ঘাসের উপড় ফেলে দেয়।

রিতার অনুভূতি লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তার ভাবনারা ইতোমধ্যে উড়ে চলে গেছে। ছটফট করতে থাকে সে । এ হিংস্র থাবা থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনা। লৌহকঠিন হাতের বেড়ে সে অসহায়ের মতো নড়াচড়া করে শুধু।এর ভেতরেই সে টের পায় টান পড়েছে তার সালোয়ারের ফিতায়।

মা এসে বসলেন পাশে। বলতে ইচ্ছে করে ‘মা, এসোনা আমার পাশে ।আমাকে একা থাকতে দাও।’মাথায় কথাগুলো জড়ো হয়। কিন্তু মুখে আসেনা। বলতে পারেনা মাকে। অথচ একলা থাকতেই যে তার ভালো লাগে। মা নিশ্চয় বুঝেন তা। মারা যে অনেককিছু বুঝে ফেলেন।সন্তানের মনের গভীর পর্যন্ত দেখতে পারেন যেন তারা। তবু মা আসেন। মেয়েকে একটু সঙ্গ দিতে। কথায় কথায় একটু সময় পার করতে। মা চান মেয়েটি যেন তার একাকিত্বে না ভোগে। মেয়েটি যেন নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে না করে। তাহলে যে আরো ক্ষতি হবে তার। কথা বললে বরং একটু হালকা হতে পারে মন। মা এ আশায় পাশে বসে থাকেন। মেয়ে যদি কথা বলে একটু শান্তি পায়। কিন্তু রিতার মুখে কথা আসেনা। আসেনা মায়ের মুখেও। নীরবতার দেয়াল ছিদ্র করে দু একটি শব্দ বের হয় শুধু। এ-ও বিসদৃশ লাগে। নীরবতাই কাম্য যেন এখানে। নীরবতাই আরাধ্য। এই নীরবতায় ভাসতে ভাসতে কখনো রিতার মায়ের চোখের কোণে অশ্রু ঝিলিক দেয়। মা চান মেয়ে যেন তা না দেখে। মেয়ে না দেখুক তার তার ভেতরের প্রদাহ  হয়ে নামছে। তাহলে যে মেয়ের ব্যাথাতুর মন আরো তীব্র ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠবে। সে যে আরো ঝিমিয়ে যাবে। তাই মা অশ্রু মুছে ফেলেন চুপে। যেন কিছুই হয়নি।

পারে। মার যন্ত্রণাগুলো যেন তার মুখস্থ হয়ে গেছে। সে জানে তাদের দিকে মানুষ এখন তেরছাভাবে তাকায়। এ তাকানোতে লেগে থাকে বিদ্রুপ। মাকে তাই আগে বলতো-‘আমার জন্য তোমরা পড়ছো জ্বালায়।’ এ কথায় মার কষ্টগুলো  যেন আরো বেড়ে যায়। কখনো কখনো রাগ প্রকাশ করেন।তাই সে আর এ কথা বলেনা।

মায়ের বুকে মাথা রেখেই তো রিতা প্রথমে বলেছিলো-‘পশুটা আমারে শেষ কইর্যা দিছে মা।’ সে কি কান্না মাযের তখন। বুক ফেটে আসছিলো যেন। এই বিকেলে তার পাশে বসে চুপে চোখের পানি ফেললেও মা সেদিন কেঁদে অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন। মেয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সম্ভাব্য নানা নেতিবাচক পরিণতি তার মনকে অস্থির করে তুলে। নানা আশংকায় ভরপুর করে তুলে। তাই ফোঁপানো কান্না দ্রুত গতি পায়। তীব্র বেগে নামে অশ্রুর ধারা। এই-ই,প্রথম এবং শেষবার।মা এভাবে আর কাঁদেননি। শব্দহীন কান্না সেদিনই প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে।

সেদিন, সেই ভংয়কর দুপুরে তার উরু বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিলো।রক্ত তো সেই ছোটবেলা থেকে অনেকভাবেই পড়েছে। হাত কেটেছে, পা কেটেছে,ঠোঁট ফেটেছে,নখ কাটতে গিয়ে আঙ্গুল কেটে গিয়েছে।এ ছাড়া শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়ায় তো রক্ত বেরিয়ে এসেছিলো, যা জীবনে ভিন্ন ধরণের এক উপলব্ধি এনে দিয়েছিলো, অন্য রকমের এক পুলক এনে দিয়েছিলো  অনুভূতিতে। কিন্তু সেসব রক্ত ঝরার সাথে সেদিনের রক্ত ঝরার কোন মিল নেই।অনেক ছটফট করেছিলো সেদিন রিতা।সালোয়ারটা একটানে গা থেকে সরিয়ে  ফেলার পরও অবশিষ্ট  শক্তিটুকু  দিয়ে চিৎকার দিয়েছিলো।কিন্তু পৌঁছায়নি কোথাও। নিশ্চয় তা হারিয়ে গিয়েছিলো গাছপালার ফাঁক  দিয়ে, যেমন অনুমিত ছিলো। এরপর রিতা টের পায় লৌহদণ্ডের মতো কিছু একটা তাকে বিদ্ধ করে ভেতরে ঢুকছে। সে তখন চোখে অন্ধকার দেখে আর অনুভব করে পৃথিবীটা দ্রুতবেগে ঘুরছে। বান্ধবীরা কি বাসায় গিয়ে তার কথা জানিয়েছে? জানিয়ে থাকলে মা বাবা কি করছেন? এসব তার মাথায় আসেনা।মাথা তো ঘোলাটে হয়ে গেছে। দৃষ্টি তো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।এর মধ্যেই শফিক তার উপর দুইবার চেপেছে। আর এতে করে তার উরুতে রক্ত লেগেছে। শুধু রক্ত নয় রিতা দেখে এ জায়গায় আঠালো পদার্থও লেপ্টে আছে। গা ঘুলিয়ে উঠে তা দেখে। ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে নিজেকে। যদি সম্ভব হতো তাহলে হয়তো তা-ই করতো নিজেকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দিতো বাতাসে। পারেনা তা করতে। বরং কড়া স্বরে শুনে ,‘নে,সেলোয়ার পইর‌্যা  বাসায় যা।কোনভাবে আমার কথা প্রকাশ পাইলে অবস্থা খারাপ কইর‌্যা দিমু।’এ কথা বলে শফিক রিতাকে রাস্তার পাশে রেখে চলে যায়।

এরপর বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করেনা। এ শরীর নিয়ে মা-বাবার সামনে যেতে চায়না মন। বিস্তৃত নির্জনতার ভেতর ডুবে থাকতেও ইচ্ছে করেনা। তাহলে কি করবে সে? তাকে আক্রমণ করে বসে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা যা একটানা কিছুসময় ধরে চলে হাঁপিয়ে তুলে তাকে। এই অবস্থায় থাকতে থাকেতেই একটি খালি সিএনজি অটোরিক্সা এলে তাতে চড়ে ড্রাইভারকে সদরের দিকে যেতে বলে।

রিতার বাবা খবর শুনেই বের হয়েছিলেন মেয়ের খোঁজে-পরে মায়ের কাছে শুনেছে রিতা। বাবার চেহারা তখন কেমন হয়েছিলো? রিতা কল্পনায় আনতে চেষ্টা করে। আসে কি পুরুটা? হয়তো নয়। সে এমনই ভাবে।আতঙ্ক তো থাকবেই, তার চেয়ে বেশি কিছু? নিশ্চয় সেখানে আরো অনেক কিছু ছিলো।নইলে সে ফিরে আসার পর বাবা থানায়ই বা যাবেন কেন মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে। মা চাননি বাবা থানায় যান। আর না প্রচার হোক এ ঘটনার।মার নরম মন মেয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। এমনিতেই তো অনেকে জেনে গেছে যেহেতু রিতাকে তুলে নেয়ার সময় অনেকে দেখেছে। ঘটনা এ পর্যন্তই থাক। কিন্তু  রিতার বাবা নাছোড়। রিতা তার মাকে যতটুকু বলেছে, সবতো আর বলতে পারেনি, ততটুকু শুনে তার বাবা বললেন-‘যে আমার মেয়ের এতবড় সর্বনাশ করছে তাকে এমনি এমনি ছাইড়্যা দিতে পারিনা।’

পুলিশ শফিকের নামে মামলা নিতে ইতস্তত করলেও শেষপর্যন্ত নথিভুক্ত করে। যদিও জানা নেই এর পরিণাম আসলে কি হবে তবু শান্তি পেলেন কিছুটা।

সেদিনের পর আর কলেজে যাওয়া হয়নি। যাওয়া হয়নি অন্যকোথাও।তাই হয়তো এখনকার মতো আর কখনো এতটা একা, এতটা নিঃসঙ্গ লাগেনি। অথচ কলেজে যাওয়া খুব প্রয়োজন ছিলো। প্রতিবেশী বান্ধবী দুজন এসেছিলো তাকে কলেজে নিয়ে যেতে। নির্বাচনী পরীক্ষার আগে নাকি সবাইকে একটা নির্দিষ্ট ক্লাসে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। তাদেরকে বলে দিয়েছিলো যে,যাবে না ক্লাসে। অথচ তারা খুব আগ্রহ ও দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলো যে রিতা যাবে তাদের সাথে। পিয়া বলেছিলো‘এভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকলে চলবে রিতা?’

-বের হয়ে কি করবো?কি আছে আমার আর?  কি হবে ক্লাসে না গেলে?

বইয়ের সাথে তো কোন সম্পর্ক নেই। ইচ্ছে করেনা বই হাতে নিতে। অথচ সামনে নির্বাচনী পরীক্ষা।এর ক’মাস পর ফাইনাল পরীক্ষা। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে একদিন বসেছিলো টেবিলে বই হাতে নিয়ে। কিন্তু পারেনা, পড়তে পারেনা। বইয়ের ছাপা অক্ষরগুলোর ফাঁকে উঠে আসে সেই দুপুরের স্মৃতি।ভাবে তখন-‘পড়বোনা আমি।আর পড়বোনা,আর যাবোনা কোনদিন ঐ পথে।যে পথ আমাকে দিয়েছে একরাশ কালিমা।’

বাবার চেহারা এখন কেমন শুকনো হয়ে থাকে।কী যে খেলে এখানে?  কী যে খেলে? বাবা এমন হয়ে গেলো কেন?  বাবাতো এমন ছিলোনা। বাবাতো প্রাণ খোলে কথা বলতো তাদের সাথে। অথচ এখন কেমন নিশ্চুপ হয়ে থাকে।

বাবার সাথে তো সদরের অনেক মানুষের যোগাযোগ।  বাবা তাদের কাছে গিয়ে অনেক সময় কাটাতো। তারা আসতো বাবার কাছে। এখন কোনটাই হয়না। মার কাছে শুনেছে বাইরে যেতে নাকি ভালো লাগে না বাবার; বাহিরটাকে তার কাছে মনে হয় কাঁটাযুক্ত ঝোঁপ যেখানে কোনদিন তিনি যাননি।

‘হায় এমন হয়ে গেলো কেন?বাবা,আমার সাথেও তুমি কথা বলোনা। খুব প্রয়োজন হলে মুখ খুলো শুধু। আমিও যে তোমার সামনে যেতে সংকোচ বোধ করি। তোমার এ ভঙ্গুর চেহারা দেখবো বলে ,যার জন্য আমিই দায়ী।’ -রিতার মন প্রায়ই উথাল পাথাল করে উঠে এসব ভাবনায়।

তবে রিতার বাবা মেয়ের জন্য করেছেন তো সাধ্যমতো। মামলা ঠুকেছিলেন। এরই পরম্পরায় যা অভাবিত ছিলো তার কাছে পুলিশ অতি দ্রুত শফিককে গ্রেফতার করে ফেলে।কি যে খুশি লেগেছিলো তার তখন।বিচার পাওয়ার একটা ধাপ তো অগ্রসর হলো। মেয়ের গায়ে যে কালি লেগেছে তা হয়তো তোলা যাবেনা কোনভাবেই। তা রয়ে যাবে তার মনে,মেয়ের মনে,মেয়ের মার মনে। রয়ে যাবে প্রতিবেশীদের মনে, এলাকার লোকজনের মনে। তবু যদি শফিকের একটা শাস্তি হয়। যে চিন্তারাশির ভেতর দিয়ে কয়েকদিন কেটেছে তার, সেখানে তাই হয়তো একটু প্রশান্তির হাওয়া খেলে যায়। এই হাওয়া মনকে হালকা করলে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন দিলেন থানায়।

রিতা তখন দেখেছিলো বাবার চেহারাটা। বাবাকে উল্লসিত হতে দেখেছিলো ড্রয়িংরুমে বসে। অবশ্য তার নিজের কোন অনুভূতি হয়নি তখন। কে জানে,কেন?কেন সে উৎফুল্ল হতে পারেনি। কেন সে উল্লসিত হতে পারেনি বাবার মতো। মামলার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করা মা-ও তো বাবার এ অবস্থা দেখে খুশি হয়েছিলেন। শফিকের গ্রেফতারের খবর শুনে উল্লসিত হয়েছিলেন। শুধু সে-ই মনের ভগ্ন অবস্থা নিয়ে বসেছিলো। কেননা সেই দুপুর তাকে ছাড়েনা, সেই দুপুর তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাখে সেই দুপুর তাকে নিক্ষেপ করেছে এক অদৃশ্য কারাগারে ।

তবে বেশি দেরী হয়নি। সেদিন রাতেই আশ্চর্যজনকভাবে হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু।

রিতার বাবা তখন একা বসে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ মোটরসাইকেলের শব্দ বাসার কাছে শুনে দরজা খুলে দেখেন উপজেলার নেতা শফিককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে উঠেছিলো। শফিকের দলের লোকজন প্রভাব খাটাতে পারে এটা  তার মাথায় ছিলো। কিন্তু এভাবে…। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তবু কিছু বলার জন্য মুখ খোলার চেষ্টা করেন। তার চেষ্টা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই নেতা বলে-‘আমার দলের পোলারে পুলিশ আটকাইয়া রাখতে পারব, এটা তুমি কেমনে চিন্তা করলা?’

-কিন্তু হে ত অপরাধী।

-রাখো তোমার অপরাধ। তোমার নষ্টা মেয়েই তো ফষ্টিনষ্টি করে। তোমার কোন সমস্যা অইয়্যা থাকলে আমাকে বলতা। আমরা সবাই মিইল্যা দেখতাম বিষয়টা।ঠিক আছে যা অইবার অইছে এখন মামালাটা তুইল্যা নিয়ো।

রিতার বাবা টের পান তার মাথাটা ঘুরছে। তার মেয়ে নষ্টা! এ কি শোনলেন তিনি! তার এ আদরের মেয়েটি, তার মেধাবী এ মেয়েটি….! না এ অসম্ভব,এ হতে পারেনা, নিশ্চয় না। এমন মিথ্যা কথা শুনিয়ে গেলো লোকটা! তার মেয়ে খারাপ কিছু করেনি তো কোনদিন। সে তো এ জায়গাতেই জন্মেছে, এ জায়গাতেই বড় হয়েছে। কোন খারাপ কথা তো তার সম্বন্ধে শোনা যায়নি কখনো। রিতার জন্য মনটা ভিজে আসে। চোখটাও ভিজে এলো কি? এর সাথে কানে বাজে  মামলা তুলে নিতে নেতা যে হুংকার দিয়ে গেছে তার কড়কড়ে শব্দগুলো। পিতা হয়ে কিছুই কি করা যাবেনা মেয়ের জন্য? আইন তো আছে, আদালত তো আছে, রাষ্ট্র তো ব্যবস্থা করে রেখেছে। তবুও মেয়ের জন্য কিছু করা যাবেনা?  পিতৃত্বের আসন কি টলোমলো হয়ে যাচ্ছে? দায়িত্ব কি হাওয়ায় উড়ে চলে যাচ্ছে? কোথায় লুকিয়ে রাখা যাবে এ ব্যর্থতা?

এই সন্ধ্যায় রিতার মাথায় ঘুরে চলছে অনেককিছু-‘আমার জন্যই তো এই অবস্থা।মা বাবা ঠিকমতো খেতে পারেন না, ঠিকমতো কথা বলেন না। সেদিন নেতা বলে যাওয়ার পর  শফিক নাকি বাবাকে কয়েকদিন ধমক দিয়ে বলেছে মামলা তুলে নিতে। পেছনে শেল্টার থাকলে ধমক দিবেই তো।মামলা না তুললেই বা কি? চলবে এ মামলা? বাবাকে কয়েকবার অপমানও করেছে সে।বাবা কখনো প্রতিবাদ করেছেন।কখনো করেননি। প্রতিবাদ করলে সে বরং ব্যাঙ্গ করে বেশি।মৌমিতা সেদিন বলে গেলো কয়েকদিন আগেও কলেজের সামনে মিছিলে স্লোগান দিয়েছে শফিক। আগের মতোই সে কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে মোটরসাইকেল নিয়ে। অথচ বাবা….বাবা,আমিই দায়ী তোমার এ অবস্থার জন্য।আর পারছি না এসব সহ্য করতে। এই পরিচিত ভূগোলে, এই নিজস্ব জায়গায় সবাকিছু হয়ে উঠেছে বিবমিষাময়।কি করে টিকে থাকা যায় এভাবে?  ‘তার চেয়ে ভালো -সবকিছু শেষ হয়ে যাবে -আমি যদি নিজেকে শেষ করে দেই।’ এসব ভাবতে ভাবতে মাথা ভারী হয়ে আসে রিতার। এদিকে সন্ধ্যা কেটে গিয়ে রাত নেমে আসে দ্রুত লয়ে।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: শামসুল কিবরিয়া গল্পকার। ০৫ ফেব্রয়ারি ১৯৮৫, হবিগঞ্জ জেলায়। অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।

Leave a Reply