পিয়াস মজিদের কবিতা :: গোলাপের অভিঘাত

পিয়াস মজিদের কবিতা :: গোলাপের অভিঘাত

গোলাপের অভিঘাত

একটি গীতিময় মৃত্যুর মোহে
কাটাই গদ্যধূসর জীবন
শীতার্ত ঝংকার, কুয়াশাকণ্ঠের পর আছে
রংধনুর নদী।
কৃষ্ণবসন্তের হাওয়া
এলোমেলো করে দেয় স্বপ্নসব।
পথে পথে কত লালগালিচা ভর্ৎসনা
তবু সন্তপ্ত নক্ষত্রের
রক্ত ঝরে টুপটাপ;
একলা এই বেঁচে থাকার ঢেউয়ে।
নিকষ রাত্রির কালো কালো প্রকল্পনা
সমুদ্রের স্বরগ্রামে রূপ নিলে
অথৈ জলমর্মরের কাছে
রুখাসুখা আমি
রক্তে-মাংসে ফাঁস হয়ে যাই।
অস্তগামী শেফালির ন্যায়
ফিকে হয়ে আসে জীবন
সমুদ্রে ঘনীভ‚ত জলসংগীতে
আর আকাশের আঙ্গিকে আঙ্গিকে
আছড়ে পড়ে চাঁদ।
নিখিল নিদ্রার কালে
জাগ্রত বিবিধ রক্তের ছন্দ।
বুকের মধ্যে বেঁচে থাকা
কোনো গহীন গ্রানাদা
লোরকার চেয়েও বেশি বেদুঈন করে তোলে
অদূরে কুলু কুলু আমার মৃত্যু বয়ে চলে
বেহালায় ভেঙে পড়ে
নিঃসুর সব মহাশূন্য-মহল।
নদী হৃদয় খুলে
গল্প করতে বসে
কতো গল্প, কতো গান!
নিরন্ন নীলিমার নীচে
এতো এতো ভোজসভার ঘ্রাণ শুঁকে
স্বপ্নগোলাপ গুটিয়ে নেয়
পাপড়ি তার।
দশদিকে এইমতো
ধ্বংসের টোন সত্তে¡ও
ডেসপারেট হয়ে
খুঁজছিলাম গভীর নির্জন পথ।
কিন্তু আমাদের সময় ছিলো
জনারণ্যময়,
একপাল মৃত গদ্যের কারবারি
আর প্রসাধিত অথচ ভীষণ বিকলাঙ্গ কবিতার নালা
বিস্তীর্ণ ছিলো শস্যক্ষেত্রের মতো,
সবাই জানতো এইকালে
খাদ্য থেকে শিল্প
প্রেম থেকে স্পার্ম
সকল শস্যই ছিলো ফরমালিনমণ্ডিত
তবু পুষ্পগ্রস্ত স্মৃতির সৌন্দর্যে
মরে যেতে গিয়েও বেঁচে ওঠতে হয়।
এই বেঁচে থাকা শুধু বেঁচে থাকা নয়,
মরণকে একহাত নেয়াও বটে
যদিও মৃত্যুঝরোকার জন্ম হয় প্রতি রাতে
স্বপ্নের বিরামহারা চোরাস্রোতে।
বস্তুত মৃত্যুর ছলে
আবিষ্কার করে চলি
জীবনেরই ভাবসম্প্রসারণ।
মৃত্যুগ্রস্ত জীবন বা জীবনগ্রস্ত মৃত্যুর পর্বে
চাই ঘূর্ণি অনিবার;
নদীনৃত্যের মুদ্রা শুষে
শ্যামল হয় মরুময় পরিগণ।
ফের আলোকপাত শুরু
অন্ধকার টেক্সটের প্রতি
পাহাড় ঘুমিয়ে ছিলো যদিও
গিরিমালঞ্চের বিপুল প্রবাহে
সমুদ্রের ভেসে যাওয়ার দশা;
পাতালহাওয়া ক্ষয় করে ফেলে
সমুদয় দিগন্ত।

রূপান্বিত ইত্যাকার মরণের মন্দ্র সত্ত্বেও
দেখে চলেছি
নেহায়েত একটা পুষ্পের শ্রম
প্রশাখা থেকে পাপড়ির রক্তিমে গিয়ে
ওড়ায় কেমন জয়ের কেতন!
তার ঝরে পড়া
গোধূলিকে ঘন হতে ঘনতর করে তোলে।

বিলয়ের অভূত রঙ লেগে
জন্ম হয় আমার;
শত শত নতুন গোলাপ।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: পিয়াস মজিদ কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্ম গ্রহণ করেন ২১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১২টি। গল্পগ্রন্থ ১টি। প্রবন্ধগ্রন্থ ৯টি। স্মৃতিকথামূলক বই ২টি। মুক্তগদ্যগ্রন্থ ২টি। কিশোর গদ্যগ্রন্থ ১টি। সাক্ষাৎকার সংকলন ২টি। দেশে বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কর্তব্যরত।

 

Leave a Reply