তিন কাঁটার চল গাঁথা :: আনোয়ার শাহাদাত

তিন কাঁটার চল গাঁথা :: আনোয়ার শাহাদাত

দুই ভাগ–তখনকার অংশ ও এখনকার অংশ
তখনকার অংশ–বরিশাল / গাও-গেরাম
এখনকার অংশ– নিউ ইয়র্ক / ঢাকা

তখনকার অংশ || বরিশাল / গাও-গেরাম

দেশান্তর গ্রামে সে এক অন্য রকম ঘটনা তখন দুপুর থেকে। মাছ কোপানোর চলে গেথে গেছে গ্রামের আজাহার আলী, না শিং মাছ, না বাইন মাছ, না গজাল কী চ্যাং-টাকি বা এমন কী মরার কুইচ্যা! বরং চলের কাঁটায় ‘এমনও সময়’ গেথে গেছে দেশান্তর গ্রামের আজাহারের ডান পা-খানি। সে কী কথা! মানুষের পা কেমনে চলে গাথে? এই কথা বলে সেই দুপুর থেকে কত লোক যে ঘটনা দেখতে আসে। পায়ের পাতায় চল গাঁথা আজহার আলী শোয়া বা আধা শোয়া কী ঠ্যাক দিয়ে বসা, ব্যাথায় কাতরায়, দর্শনার্থীরা আজাহার আলীকে এইরকম দেখে আবার চলেও যায়। সেই এক দৃশ্য, আজাহার পায়ে গেথে যাওয়া চল নিয়ে কেমন করে বসা। চলের কাঁটার মাথায় তার হাতল- সতেরো হাতি লম্বা বাঁশনী বাঁশ। ডান হাতে ধরে বাঁশনী বাশের ওই হাতল বাম হাতের সহায়তায় পানির নিচের কাদায় কুপিয়ে মাটি কামড়ে থাকা মাছ সেই চলের তিন কাঁটায় গেঁথে তুলে আনা নিয়মের ক্ষানিকটা অনিয়মে ওই আজাহার আলীর পা-ই এখন শিকার। ব্যাথায় আজহার আলীর মুখটা বর্ননার অদ্ভুত উপমায় ভ্যাচকানো, তা ব্যাথায়, চোখে পানি নেই, কিন্তু মনে হলে হতে পারে পানি আসতে চায়, বা এসেছিল বা আসবে হয়তো কোনো এক সময়, তা অবশ্য জরুরী নয় এইখানে। প্রায় গোটা সময় তার চোখ নিজের পায়ের দিকে, অবাক হয়ে তাকানো, যেনো এমন দৃশ্য তার জীবনে আর যেহেতু আসবেনা তাই মন ভরে দেখে নেয়া বা এই রকমই কোনো একটা কিছু, সঠিক বলা যাবেনা তবে তার এই তাকিয়ে থাকার অন্য ব্যাক্ষাও হ’তে পারে, কে জানে।
বড় তারা-বাইন মাছ কোপানোর ‘চল’এর প্রায় সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা তিন কাঁটার লোহার ফলার দু’টো কাঁটা আজাহার আলীর ডান পায়ের পাতায় গেঁথে আছে এই পৌনে দু’প্রহর রাত পর্যন্ত, সেই দুপুর থেকে। ফলার তিন কাঁটার এক কাঁটা পায়ের পাতার মাঝখানে, অপরটি পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ও তার পাশের আঙ্গুলের ঠিক উপরে, বাকি কাঁটাটি পায়ের বাইরে। পায়ে গেথে নেই এই কাঁটাটা নিয়ে ‘চলগাঁথা’ আজহার আলীকে দেখতে আসা দু’একজন, দু’একজন কী, অনেকেই বলেছে- ভাগ্য ভালো গোটা পা জুড়ে তিন কাঁটাই গাথে নাই। যদিও অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তার কাছে পায়ে একটি কাঁটা গাঁথাও যা, দু্‌ইটি কাঁটাও তা, তিন কাঁটাও তাই, যদিও ‘ভাগ্য ভালো’ বলে তৃতীয় কাঁটা পায়ে গাথেনি যেমন কেউ কেউ বলেছে। তার পায়ে এই চল গেথে যাওয়ায় হয়তো এমন কোনো অসুবিধা হতোনা যদিনা কাঁটার মাথা থেকে বরশির মত সুচালু আর একটি বাড়তি কাঁটা আবার উল্টা দিকে বাড়ানো থাকতো। ওই বারতি উলটা আংটার কারনেই আর তা খোলা যাচ্ছে না, টান দিয়ে খুলতে গেলে পুরো পায়ের মাংশ খুলে আসতে চাইবে, থেতলে যাবে পুরা পা’খানি আর তাতে করে সেই থেকে আরো অনেক কিছুই হতে পারে। কাঁটার ওই উলটা আংটার থাকার কারন- চলের কোপের নিচে বাইন বা শিং মাছ পড়লে আর যাতে বের হতে না পারে, বড়শির মতন, বড়শি নিয়ম। আহা! এখন ওই কাঁটার ওই নিয়ম, ওই প্রয়োজনীয়তা থেকে আজাহার আলীই বেরুতে পারছেনা সহসা, বা তাকে বের করে আনাও যাচ্ছেনা। এই হলো গিয়ে ঘটনা।
সেই-ই এক অবস্থা – বাইনও না, শিংও না, মাছের মাছ কিছুই না, ও কেবল আজাহার আলীর পা; ঘটনা তখন- দুপুর থেকে, দেশান্ত নামের গ্রামে, ওই রকম সময়ে, ওই রকম ঘটনা যেমন এমন কেউ কখনো শোনেনি। আজহার পায়ে চল নিয়ে শুয়ে থাকে, তখন রাত কত হবে জানা যায়না, হয়তো অমাবস্যা পর ছয়দিন হবে, সেই হিসেবে ক’দিন আগে‌ই চাঁদ উঠেছে যে, কে জানে নিশ্চিত, হলে তবে পঞ্চমী তা হতে পারে, বাঁশনী বাশের ঝাড়ের উপর দিয়ে কেবল চাঁদ ঝুলে পড়েছে, চাঁদের লম্বাটে অদ্ভুত এক ছায়া নেমেছে তখন আজাহারদের উঠান জুড়ে, সেই ছায়া ক্রমে অন্ধকার হতে থাকে। চলের সতেরো হাতি হাতলের কারনে আজাহারকে ঘরের বাইরে শুয়ে থাকতে হয়। দুপুর থেকে তাকে দেখতে আসা বা সমবেদনা জানাতে আসা দর্শনার্থীরা আর থাকেনা, সেটাই নিয়ম। এখন বা এরপর আজহারের কী হবে কৌতুহলের উত্তরে সবাই জানে মিডা-মুইখ্যা মুখচোরা-চাড়াল-উটচোঙ্গা-চোদনা ছয়ফুইর‌্যা সাড়ে সাত মাইল দুরের চামটার হাট লাগ কামার কান্দায় গেছে লোহা ঘষে ক্ষওয়ানোর শিশার ধাতব র‌্যাত আনতে, সেই র‌্যাত দিয়ে চলের ফলার উল্টা-কাঁটা ঘষে ক্ষয়ে সমান করে তারপর দু’কাঁটা বের করে এনে তবে চলগাঁথা আজাহারকে মুক্ত করা হবে। আজাহারের চল-মুক্তির এই একমাত্র পথ থাকে। মাইজ্যা ফকির, যাকে ছাড়া প্রায় এলাকার কোনো ধরনের সমস্যার সমাধানের উপায় থাকেনা, সে নাই, গ্যাছে শহর বরিশালে, আইনের কাজ, কোট-কাচারী। ওইদিনই ফিরে আসবার কথা, তবে কিনা তার আসতে আসতে মাঝ রাত। তবুও ওই ধারনাই থাকে যে কুমার কান্দায় গিয়ে শিশার র‌্যাত আনা, সেই র‌্যাতে ঘষে তার পর চল কাঁটা বের করা। কুমার কান্দা থেকে র‌্যাত আনার দায় উটচোঙ্গা-ছয়ফুরের উপরই পরে, তার প্রধান কারন ওটা উটচোঙ্গারই চল যা আজাহারের পায়ে গেথেছে।
তারা জনা পাঁচেক মিলে দুপুরে ব্যাদনার বান্দা খালে বাইন মাছ মারবে বলে চল কোপাতে যায়। ছোটো খাটো দল করে বান্ধা খালে মাছ কোপানো একটা নিয়মের মতন। আরা-আরি লাইন বেধে পাঁচটি চল একসঙ্গে কোপালে আর কোনো বাইন বা শিং পালাতে পারবে না, কারো না কারো চলে ধরা পরবেই, সে রকম ধারনা থেকেই এই নিয়ম। এটা একটা বিনোদনও, মাছ ধরতে গিয়ে মজা করা। চল কোপাতে কোপাতে পুরুষ প্রধান নানা গল্প তারা মিলে মিশে করতে পারে, প্রধানত নারী বিষয়ক। চল কোপানো আর পাঁচ মিশালের ওই রকম গল্পের ছেদ পরে যখন কিনা কারো চলের নীচে কোনো মাছ পরে। কেবল সে-ই পানিতে ডুব দিয়ে মাছ তুলে আনতে যাবে যার চল ‘ডাক দেবে’, অন্যেরা তাদের কোপানো তখন বন্ধ রাখবে যতক্ষনে না ওই ব্যাক্তি চলে গেথে যাওয়া মাছ নিয়ে উপরে উঠে আসে। আজাহার তার চলে সামান্য অনুভব করে কোনো মাছ পরেছে বলে, হাভ-ভাব দেখে বোঝা যায় তা ‘ছোটো ডাক’, তখন উটচোঙ্গা ছয়ফুরই বলে চাঁন্দু দিহি লাগাইছে তারা বাইন, আজাহার তার উত্তরে- না, মনে হয়না, চ্যাং নইলে ছোডো শিংগ অইবে এ কথা বলে ডুব দিয়ে চলের গোরায় যায় মাছ সহ চল তুলে আনতে। ঠিক সেই মুহুর্তে উটচোঙ্গা ছয়ফুরের চলের একটা কোপ আজাহারের পায়ে এভাবে গাথে। ঠুন্ডা হাইব্যা তার হাতের চল খাল তীরে ছুড়ে মেরে তখন উটচোঙ্গা ছয়ফুরকে বলে –মাউগেরফো তোরে মানষে চুইদ্যা পয়দা হরে নাই, এমন মার্ডার ক্যামনে হরলি, তুইতো অরে মার্ডার করার কোপ মারলি, মাউগেরফো তুই মানুষনা। ওই পর্যন্তই, এর পর ধরে সবাই আজাহারকে বাড়ীতে নিয়ে আসে। পানির মধ্যের ওই কোপ ডুব দেয়া আজাহারের মাথায়ও লাগতে পারতো, কী বুকে, কী পেটে, এসব কথা হয়তো এদের কেউই ভাবেনি, আর ভাবলেই বা কী, যা হওয়ার তাতো হয়েই গ্যাছে। তাছাড়া এই শ্রেনীর ভাবনার জগত অতটা অনুভুতি প্রবন বা প্রখর নয় যতটা হলে পরে যাবতীয় ভাবনা আসে। তবে পানি থেকে কিনারে তোলবার পর আজাহার একবার গভীর চোখে উটচোঙ্গা ছয়ফুরের দিকে তাকায়, সেই তাকানো দেখলে মনে হয় কিছু বলার ছিল, বলার থাকলেও খাকতে পারে বা পারতো, কিন্তু বলেনা, যা মনে মনে বলে- চোদনার ফো উটচোঙ্গা ছয়ফুইর‌্যা চাইলি চলের কোপটা মোর মাথায় লাগাইতে জোহারারে রারী আর রুস্তমরে এতিম বানাইতে। আজাহার এসবের কিছুই বলেনি মুখ খুলে, ‘যা করে আল্লা’ মনোভাবে অপেক্ষা করতে থাকে, এছাড়া অবশ্য তার আর তেমন কিছু করবারও থাকেনা।

অবশেষে এই দাড়ায়, যারা দুপুর থেকে বিকেল থেকে সন্ধ্যা থেকে এক প্রহর কী রাত অবধি থাকে এবং নানা কথা বলে ও শোনে, তারাও সবাই একসময় চলে যায়। কেবল জোহারা আর তার দেড় বছরের ছেলে রুস্তম ছাড়া কাউকেই আর থাকতে হয়না, সেটাই একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে এখানে। দু’এক জন ছিল এখানে জোহরার সঙ্গে, এটা সেটা লাগলে এনে দেয়া, রুস্তম অযৈাক্তিক শিশুপোযোগী কেঁদে উঠলে জোহরার হয়ে হয়তো তাকে একটু সামলানো, তারাও চলে গেছে সবাই। কেবল মা ছেলে আর আজাহারকেই রাত অবধি অপেক্ষা করতে হয় কুমার কান্দা থেকে র‌্যাত নিয়ে উটচোঙ্গার ফিরে আসার জন্য। যখন কিনা হয়তো সেই পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে যায়-যায় বাঁশনী বাঁশ ঝাড়ের পেছেনে, যখন ক্লান্ত জোহরা আঁচল ভিজিয়ে মুছে দেয় ব্যাথার কাতরতায় বেরিয়ে আসা আজাহারের মুখের লালা। যখন স্বামীকে খুব দুরের অচেনা কেউ মনে হয় স্ত্রীর। যখন ‘ঘুমাইয়েন না কিন্তু রুস্তমের বাপ, ঘুমাইয়েন না’ এমন কথায় অব্যক্ত হাহাকারে জোহরা উত্কন্ঠায় অস্থির ওই কথার অর্থ না ভাঙ্গিয়ে, যদিও যখন কিনা তারা দুজনই জানে কেনো জোহরা এমন কথা বলে ‘ঘুমাইয়েন না রুস্তমের বাপ’। যখন দের বছরের রুস্তমের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়না তার বাবার সে কী যে অবস্থা এবং সেও ঘুমিয়ে পরে, যখন কেউ থাকেনা তখন, কেউনা। কেবল চল, চলের বাঁশনি বাঁশ, চল ফলার তিন কাঁটার দুই কাঁটা তাও কিনা আজাহারের পায়ের পায়ের পাতাম মধ্যে, পরম সত্যের মধ্যে, ক্লান্ত-শ্রান্ত জোহরা, ঘুমন্ত ছেলে রুস্তম, বাশঝাড়ের পেছনের চাঁদ, এইসবই চারপাশে থাকে তখন। অমন চাঁদের ছায়া-অন্ধকারে জোহরা ছেলের গায়ে পরা শিশিরের ঠান্ডা অনুভব করে, তখন নিজেরই নির্মিত ছন্দে আরো একবার বলে, ‘রুস্তমের বাপ ঘুমাইয়েন না কিন্তু, ঘুমাইয়েননা না মোর জোয়ান-ভাতার, মুই রুস্তমরে ঘরের মইধ্যে রাইক্যা আই’ এই ফাকে। মুখ দিয়ে অবিরাম লালা ঝরতে থাকা আজাহার সাড়া দেয়না, হয়তো সাড়া দিতে পারেওনা। জোহরা ঘরের মধ্যে যায় রুস্তমকে রাখতে। এই ফাকে রুস্তমের বাবা, যাকে এখন কেবল ‘চল আজাহার’ই বলতে হয়, সেই ‘চল আজাহার’ হয়তো ঘুমায়, সেই এক ঘুম, যে ঘুমকে জোহরা ভয় পেয়ে বার-বার অনুরোধ করে- ঘুমাইয়েননা কিন্তু, ঘুমাইয়েন না। অথচ সেইতো সেই রকমই ঘুম, বা তার চেয়ে ক্ষানিকটা ভিন্নতর ঘুম, যে-ই ঘুমে ‘সত্য’ স্বপ্ন হয়ে ওঠে, বা ‘স্বপ্ন’ সত্য হয়ে ওঠে, ঠিক বোঝা যায়না কোনটা কী, ঘুম না স্বপ্ন, স্বপ্ন না ঘুম, পায়ে ভারী কাঁটা গাঁথা চল নিয়ে তখন সেই রাতে, বাশ ঝাড়ের পেছনে যখন পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে যেতে থাকে অমোঘ নিয়মে তখন স্বপনে না অস্বপনে তার কোনো ঠিক ঠিকানা থাকেনা, এরই মধ্যে যেনো, যেনো এরই মধ্যে, শোনে তার কান, কানে শোনে, যা না শোনার হয়তো, তাই শোনে, তা জোহরার কথা-
কেডা? কেডা এইহানে, আপনে চামডার আডে যায়ন নাই র‌্যাত আনতে, র‌্যাত কই? জোহরার এই কথার উত্তরে উটচোঙ্গা কী বলে তা আর আজহারের কান শোনেনা, শোনা যায়ওনা, সে শুধু আবারো জোহরা কথাই শুনতে পায়-
খবরদার ধইরেননা, ধইরেন না আমারে, আগাইয়েন না, আপনি তারে ইচ্ছা কইর‌্যা কোপাইছেন, খুন করতে চাইছেন তারে, আমারে চোদবেন বইল্যা, আমারে ভাত খাওয়ানের লইগ্যা জান দেবে হে আর রাইত বিরাইতে চোদবেন আইস্যা আপনি, এমন পশু, খবরদার, খবরদার কইলাম, আপনে র‌্যাত আনতে যাইন্নায়, ভাবেন, ভাবেন দেহি, আমার ভাতার আপনেরে কোপাইছে, আপনেরে খুন করতে চায়, সে আপনের বউরে চোদবে বইল্যা, খালি চোদবেন বইল্যা, এক মাতারিরে রারী, এক পোলারে এতিম, একটা লোক খুন, সবই আপনি করতে পারলেন কেবল আমারে চোদবেন বইল্যা, কইলাম ছাড়েন, কইলাম ছাড়েন আমারে, নাইলে কিন্তু কুত্তার কামড়া মাইর‌্যা আপনের খুনি ধোন ছিইড়্যা ফালাইয়া পানের ছাবলার মতো চাবাইয়া খাডাশরে খাওয়ামু, কইলাম মোরে ছারেন, মানুষটা ওইহানে মরতাছে, ছাড়েন আমারে। আজাহারের মনে হয় সে এই স্বপ্ন দেখে, আর স্বপনের মধ্যে তার মুখ থেকে কলেরার ঝোলা বমির মত লালা বের হয়, সারা দিনে বাথায় ভ্যাসকানো সত্ত্বেও যে পানি আসে নাই, সেই পানি, সেই লালা তার মুখ দিয়ে বমির মত ঝড়ে এখন, এ কেমন স্ব্প্ন তার। আজাহার ওই স্বপ্নের মধ্যেই কদু ঝাকায় ঠ্যাক দেওয়া চলের হাতলে বাশের উপর হাত রাখে, মুখের লালা-স্রোত চলের গোড়ায় ঠিক ওইখানে পায়ের পাতার উপর পরে, অনুভব হয় তা সত্য কী সত্য নয় তা জানা যায়না যে মুখের সেই লালায় তার ব্যাথা কমে যায়। থখন তার আর সময় লাগেনা চলের হাতলে হাত দিয়ে দাড়াতে, হয়তো স্বপ্ন বলে বা স্বপ্নের মত মনে হয় বলেই সেরকম, আবার এও নিশ্চিতও না সেটা সত্য নাকি মিথ্যা। এর পরও কোনো অসুবিধা হয়না আজাহারের একটান মেরে পা থেকে চলের কাঁটা তুলে আনতে, উহ! বা আহ! শব্দ ছাড়াই। কোনো কষ্ট হয়না এর পর আস্থার পায়ে হেটে যেতে নিজের ঘরের দিকে যেখানে ‘ছাড়েন-ছাড়েন’ বলে একটা লড়াই তার স্ত্রী করে যাচ্ছে উটচোঙ্গার সঙ্গে, তার চোখে হোক আলো-আধার দ্বন্দ, হোক ঝলকানো অন্ধকার, কোনো অসুবিধাই হয়না, যা দেখতে চাওয়ার তা দেখতে, উটচোঙ্গারে সে লাথিটা মারে যে পায়ে চল গেথেছিল সে পা দিয়েই, লাথিতে জোহরার উপর থেকে উটচোঙ্গা ঘরের বেড়ায় পরলে বেড়া মচমচিয়ে ভাঙছে তা বোঝা যায়। তার পর কে জানে কোথা থেকে আসে আজাহারের এক অসুরের শক্তি, কুরালে কাঠ কাঁটার হিক্কার মতো হিক্কা তুলে হেইও বলে উটচোঙ্গার বুকের বাম বরাবর ফের গাথে ভারী ওই তিন কাঁটার চল, একটা শব্দ উটচোঙ্গা উচ্চারন করে তখন- কী হরলিরে আজাহার? কী আর হরলাম হারামীর ফো, যা তুই হরছ তাই হরলাম, তয় তোর বউ, হুইন্যা রাখ, তোর বউরে কোনো অশান্তি করবার লোক মুইনা। পাশে জোহরাও কিছু বলে হয়তো কাপর গোছাতে গোছাতে, হয়তো শোয়া থেকে উঠতে উঠতে- ভালই করছেন রুস্তমের বাপ। চৌদ্দ বন্দি ঘরের ভেতরে ঘুম পাড়ানো রুস্তম তার দের বছর উপোযোগী ঘুমন্ত কোতায়, পাশে শেষ কোতানীটা উটচোঙ্গাও কোতায়, জোহরা রুস্তমের কোতানোকে উদ্দেশ্য করে ক্লান্ত কন্ঠে বলে- কিছু নারে বাজান তুই ঘুমা, যখন তার কোমরে নতুন করে শাড়ীতে আবার গিট দেয়, আচল ঘুরিয়ে কাধের উপর দিয়ে কোমরে প্যাচায়। যতক্ষনে না আজাহার নিশ্চিত হয় যে উটচুঙ্গার শেষ শ্বাস পড়েছে ততক্ষনে আজাহার তার চল সব শক্তি দিয়ে চেপে ধরে, আর তার চল গাঁথা পা-টা উটচোঙ্গার পেটের উপর যেখানে একজনের শুকিয়ে যাওয়া পায়ের রক্ত আর আরএকজনের তাজা বুকের রক্তের একটা মিলন হয়।
মেজো ফকির প্রায় ওর কিছু সময় আগে ফেরে জেলা শহরের জুরির কাজ সেরে, ভাত খেতে খেতে তার ছেলে ও বউয়ের কাছ থেকে শোনে। সাধারনত ফকির কোথাও থেকে ফিরলে স্ত্রী ভাত খাওয়ার সময় কোনো কথা উঠায়না, সেটাই নিয়মে দাড়িয়েছে, ভাত খেয়ে পান খেয়ে হুক্কার নলে টান দিয়ে ফকিরই জানতে চায় স্ত্রীকে যে তার অনুপস্থিতিতে কোথায় কী ঘটল। ওইদিন ব্যাতিক্রম হয়ে পরে, বারো বছরের সপ্তম শ্রেনীর ইয়াসিন ফকির ঝাটিবুনিয়া হাইস্কুল থেকে ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে, সে-ই বাবার সামনে কথাটা বলে। মেজো ফকির ভাত খাওয়া থামায়, -তা এখন কী অবস্থা আজাহারের? ওইরকমই চল গাঁথা অবস্থায় উঠানে পরে আছে, উটচোঙ্গা চামটার হাটের কামার কান্দা গেছে শিষার র‌্যাত আনতে। মেজো ফকির পানির বাটি নিয়ে হাত ধোয় অসমাপ্ত ভাতের মধ্যে। স্ত্রী যদিও বলে খাওয়াটা একটু শেষ করলে হইতোনা? হাত ধুইতে ধুইতে ফকির ছেলেকে বলে- ইয়াসিন বাবা, নারকেল ডগা দিয়া লুফা বানাও, স্ত্রীকে বলে তুমিও যাবা, দ্যাখো মিস্ত্রি বাক্সে কী আছে আতুর-বাটল বা কী কী, দেখি কেমনে বাইর করন যায় চল।
ঠিক এইরকম সময় মেজো ফকিরের উঠানে এসে পরে জোহরা – ও মাইজ্যা বাউজ, ভাইজান কী আইচে, আমাগোর কপালে না জানি কী আছে। রুস্তমের বাপ— সে আর কিছু বলতে পারেনা। মেজো ফকির বেরিয়ে এসে সব শোনে। রুস্তমের মা যাও বাড়ীতে যাও, আজাহাররে লইয়া জাগইর দেও, ওই জাগইর হুইন্যা আমারা আইতাছি, তারপর দ্যাহন যাউক কী করন যায়, যাও শিগগির যাও, আর শোনো তোমারে উটচোঙ্গা রেপ করতে আইছে এইডা কইতে লয়জ্জা পাইও না, তোমারে ওই রেপ করনের সময় আজাহার বাধা দিতে আইলে তারে হারামীর বাচ্চা খুন করতে চাইলে তার হাত দিয়া বাচনের জন্যই আজাহার ওই কাজ করে, যাও বাড়ী যাও জাগইর দেও। মেজো ফকির স্ত্রীকে বলে সিন্দুক খোলো, বন্দুক বাইর করো। স্ত্রী তারও আগে বলে নেয় গুলি-টুলি ছাড়েন বুঝি, ছাড়লেও আকাশে।
চিত্কার শুনে মেজো ফকির তার ছেলে স্ত্রী যেমন জোহরাদের বাড়ীতে জড় হয় তেমনি গ্রামের প্রায় সবাই হাজির হয়। মেজো ফকির আকাশে তিনটা গুলি ছাড়ে তার দোনালা বন্দুকে। উঠানে নামিয়ে সোজা করে শোয়ানো হয় ছয়ফুরের লাশ। সকাল হলে এমন সত্য প্রায় কারোই বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয়না- ছয়ফুর যেই কাজ করেছে তাতে আজাহারের এছাড়া আর কিছু করার ছিলনা। যদিও পাশের গ্রামের পাঞ্চায়েত বাড়ী থেকে আপত্তি ছিল। তা যতনা ছয়ফুরের মৃত্যু তার চেয়েও বেশি ওর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল কিনা তাদের বিরোধী মেজো ফকির। আবার গুলিও ছাড়ল কিনা তিন তিনটা, সেই গুলি নাকি পঞ্চায়েত বাড়ীর উপর দিয়া শাঁ-শাঁ করে উড়ে গিয়ে দক্ষিনের বিলে পরে, সেই বিলে তখন বালি হাস থাকলে তা শিকার হয়ে যাওয়ার কথা। তারপরও দিনকাল পঞ্চায়েত বাড়ীর অনুকুলে নয় বলে হয়তো অতটা জোর দিয়ে আর বিষয়টি খেলতে পারেনা তারা। এ সত্ত্বেও সকালে তাদের হয়ে একজন এসেছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ‘ছয়ফুরের মার্ডার’ প্রশ্ন উঠালে মেজো ফকিরের বারো বছরের সপ্তম শ্রেনীর ইয়াসীনই তাকে ধমকায়- তার আগে হাতে ল্যাজা নিয়ে মাটিতে শক্ত কোপ মারে, হয়তো একটা অর্থ সে করতে চায় ওই কোপ মেরে, ওই মিয়া স্বামী মার্ডার কইর‌্যা বউ রেপ করার লোক অ্যা? এই মামলায়া না জড়াইতে চাইলে এক্ষনি বিদায় হও। উপস্থিত লোকজন দ্যাখে কেমন করে একটা বয়স্ক লোককে মাটিতে ল্যাজা কুপিয়ে ক্ষামি মেরে বারো বছরের ইয়াসিন ফকির ধমকায়। তাকে আর গ্রামবাসীর মনে হয়না যে কোনো ছোট বালক। সে উঠান থেকে ডাকে ও বাছা ও বাছা জেনা করনেওয়ালা কী একলা আছিল না ওর লগে অন্য কেউ আছিল? জোহরা বালক ইয়াসীনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলবার আগে সে আবার ওই লোকটিকে বলে তার লগে কী অন্য কেউ আছিল? তুমি নাতো, যাও, যাও নিজের বাড়ী যাও। এরপর যথারীতি উটচোঙ্গা ছয়ফুরের জানাজা হয়, কবর সহ যা যা হওয়ার তা হয়। যদিও বোঝা যায় কেউ না কেউ থানায় খবর দেবে, পুলিশ দারোগা আসবে, তারা মেজো ফকিরের অভিমত ছাড়া কিছুই করবে না। পরের দিন ফকির বাড়ীতে খাশী কেনা হয়, ঘুষের যোগার হয়, যদি পুলিশ আসে তা মোকাবেলা করতে। পুলিশ আর আসে না তার কারন ওই রাতেই এই ঘটনার চাইতেও আরও একটি ঘটনা ঘটে যাতে পুলিশের কাছে এই ঘটনা তুচ্ছ হয়ে পরে।

এখনকার অংশ || নিউ ইয়র্ক ও ঢাকা

ঢাকা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার অফিসিয়াল ইমেইল এ্যাড্রেসে একটি মেইল এলো যা রোমানে অন্য ভাষায় লেখা বলে সেক্রেটারী পড়তে না পেরে আমাকে বললে দেখলাম তাতে সেন্ডার- রুম্মান আজাহার নামের একজন, আমারও চিনবার কথা নয়। যদিও মেইলের টেক্সট পরে জানলাম এ আমাদের রুস্তম আলী, আজাহার আলীর ছেলে, যে নিউ ইয়র্কে থাকে, কিভাবে মনে করতে পারিনা কিন্তু তথ্যটি আমার জানা ছিল। চিঠি পড়ে জানলাম সে এখানে অনেক বড় ধরনের ব্যবসা করে, যদিও খুব বিনয়ের সঙ্গে অনেক দুর থেকে আমাকে এসব জানানো হলো এবং অনুমতি চাওয়া হলো যদি সে একদিন আমাকে ফোন করতে পারে এবং আমার সঙ্গে দেখা করতে পারে। সময় নিয়ে আমিই তাকে ফোন করলাম এবং একদিন শুক্রবার বিকালে ম্যানহাটানে পার্ক সাউথের ববি ভ্যান’স রেস্টুরেন্টে আসতে বললাম। অনেকদির পর আমার স্টেক-হুইস্কি’র অজুহাত পাওয়া গেল। আমার মনে পড়ে প্রায় ৩১ বছর আগে ওকে দেখেছি, ল্যাংটা, ডোবার কাদায় বাবার সঙ্গে মাছ ধরার সময় খেলছে। আমি বরিশাল শহর থেকে গ্রামে গেছি আই, এ, পরীক্ষার ফরম ফিলাপ এর টাকা আনতে, বাবার কার্তিকের দক্ষিনা ধান বেচে টাকা যোগার করে রাখবার কথা। ডোবার ধারে আম গাছ তলায় এসে ছাতা বন্ধ করে দাড়ালাম যখন আমি তখন ওর বাবা আমাকে দেখিয়ে বলল- বাজান তারে সালাম দেও, সে তোমাদের বড় ভাই সম্পর্কে, তুমি তারে দাদা কইয়া বোলাবা । আমি বলবার মত আর কিছু খুজে না পেয়ে বললাম তা রুস্তম আমার গায়ে একটু কাদা দিয়া দেও, রুস্তম যেহেতু কাদা নিয়ে খেলছিল। লাজুক রুস্তম মাথা দুলিয়ে না বলে। পাশে বড় পুকুরের ওপার থেকে আমার মা শুনে বলল দে রুস্তম দে পাগলডারে একটু কাদা দিয়া দে, আহ-হারে চাওয়ার আর জিনিষ নাই, এটটু কাদা। আমি জানি মা একটু পরেই ঝাপিয়ে ঝাপটে ধরবে- না খাইয় শুকাইয়া গেছি বলে! একটু মা নিয়মের ‘কারনহীন’ কাঁদবে, সে আমি জানি, এই বাঙালী মায়েদের নিয়তি। রেস্টুরেন্টের বুকড্ টেবেলে দেখলাম রুস্তম আগেই এসেছে, দুর থেকে দেখেই দাড়াল, এতদিন পর রুস্তম সেরকমই একটি স্বরে ‘দাদা’ বলে সালাম দিল, ওর সে সালামের উত্তর না করে আমি আমার নরম হাতের শক্ত হ্যান্ডশেক করলাম, বামহাত ঘুরিয়ে ওর ডান কাধেঁর উপর দিয়ে পিঠ চাপড়ে দিলাম। বললাম কী ডাকবো রুস্তম না রুম্মান? ও তিনবার করে বলল রুস্তম রুস্তম রুস্তম। অসম্ভব ‘বাঙালী ধরনের বিনীত’, ওর চোখে মুখে আমাকে ঘিরে হাজার কথা বোঝা যায় কিন্তু সাহস হচ্ছে না তাও বোঝা যায়। বলল দাদা আপনাকে তো আমার চেয়েও ছোটো দেখা যায়, আমি বললাম- ও, অনেক ওজন কমেছে, আমি পিঙ্ক্রওটিক ক্যান্সার ট্রিটমেন্টে আছিতো, তাই। আমার ক্যান্সারের কথা এত শাবলীর ভাবে বললাম যেনো এর চেয়ে আর ডাল-ভাত-ফ্রেঞ্চফ্রাইস-ম্যাশ্ড পটেয়টোও বা বীন হতে পারেনা, রুম্মান আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করলোনা, মনে হলো একটু হোচট খেল, একটু না, বেশিই কিন্তু আমার ওই শাবলীল ভঙ্গীকে অশ্রদ্ধা করতে চাইলনা তাই পর’ক্ষনেই সামলে নিল। আমি রুম্মানের পরিধানের জিনিষ ও অন্যান্য স্বাচ্ছন্দ দেখে ঠাওর করতে পারলাম ও কী পরিমান ধনাঢ্য ব্যাক্তি। আমার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার কারন হিসেবে যা বলল তা এরকম– ওর বাবা-মা শুনেছে আমি নাকি দেশে যাবো। তারা চায় আমি যদি একটু তাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজী হই। দুজনই আপনার কথা বলে কাঁদল, বলল তুই চাইলে ‘বড়মিয়া’ রাজী হবে। আমি যে কোনোনা কোনো ভাবে বড় ছেলে বলে উত্তরাধিকার সুত্রে ‘বড়মিয়া’ তা মনে করিয়ে দেয়ায় কোথায় যনো একটু ভিন্ন লাগল, ভিন্নই, আর কোনো কিছু- সুখ বা দুঃক্ষ বা ভাল না মন্দ বোঝা গেলনা। দাদা, আমি জানি আপনার জন্য হয়তো এসব খুবই বিরক্তির কিন্তু বাবা-মা বার বার বলেছে, বলিস, বলিসরে রুস্তম, বেশিদিন তো আর বাঁচবো না, রুস্তম একটু থেমে আবার বলে- একটু দেখতে চায়। মা একথা বলে খুব কেঁদেছে দাদা, আপনি নাকি দেখতে মায়ের বাবার মত লাগে, নানা ভাই নাকি আপনার মত ছিলেন দেখতে এবং আপনাকে নাকি সে ছোট বাবা’ই গন্য করে, এছাড়াও আপনি নাকি তার বাবার মতই এমন কিছু করেছেন আপনার ছোট সময়। এইসব; রুস্তমের কথা শেষ হতে চায়না যেনো। রুস্তমকে বলে দিলাম- ঠিক আছে, ওনাদেরকে বলো আমি ঢাকায় কোনো একদিন যাবো তাদের সঙ্গে দেখা করতে। দাদা বেশিনা এক থেকে দু’ঘন্টা সময় দিলেই চলবে, আমি বলে দেবো আপনাকে যেনো খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বিরক্ত না করে, রুস্তম বলল।
ঢাকা থেকে রুম্মানের সঙ্গে নিউইয়র্কে আমার যোগাযোগ হলো কিভাবে ওর বাবা-মার সঙ্গে দেখা হবে। আমার দেয়া সময় অনুযায়ী দেখলাম হোটেলের সামনে গাড়ী এলো নিতে। রুস্তমের ধনের প্রতিফলন দেখলাম ঢাকাতেও, একটি ৫০০ সিরিজের কালো মার্সিডিস, শফার ঠিক রুস্তমের মতই বিনীত সালাম দিল, সালাম যেনো এদের শেষ হয়না, পারলে মাটিতে গড়াগড়ি করে শ্রদ্ধা জানানো! ডিয়োয়েইসেস’র একটি বাড়ীতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ঢাকার গল্পের বড়লোকের বাড়ীর লিভিং রুম, যদিও এনিয়ে আমার বিরক্তির অন্ত নেই । রুস্তমের বাবা মা দুজনই আমার জন্য সামনে দাড়িয়ে ছিল। আমি আজহার চাচার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম, নুয়ে পরা জোহরা বাছার মাথায় ও কাধে হাত দিলাম, যেনো ছোট একটি মেয়েকে আদর করা, আহা! মহিলা আদরে কেমন করে উঠল, কেঁদে দিলেন- এইরকম ভুলে গেলেন বাবা আমাদের, এইরকম ভুলে গেলেন দ্যাশ? মাইজ্যা ভাইজান আর ভাউজে থাকলে কী আপনি পারেতেন কুড়ি বছরেও একবার দ্যাশে না আসতে। আজাহার চাচা জোহরা বাছাকে স্মরন করায় যে রুস্তম না তাকে এই ধরনের কথা বলতে নিষেধ করেছে। জোহরা বাছা বলে শোনবো কেনো, রুস্তম বললেই শোনবো কেনো। সে আমাদেরও ছেলে, আমি কেমনে ভুলি আমাগোর উঠানে খাড়াইয়া কেমনে পঞ্চায়েত বাড়ীর বাইট্যা-দালালডারে চোখ গরম কইর‌্যা তাফালের মাটিতে ল্যাজা কোপাইয়া বিদায় দিল। আর শ্যাখ সাইবের মরনের পর যহন একদিন বাইট্যা পঞ্চায়েত আবার ছয়ফূর মার্ডারের মামলা করবে বলল তহন বাজান আমার একটা কথা কইল শহর দিয়া আইস্যা- যে ছয়ফুর হইল যাইয়া বাংলাদেশের পেরথম রাজাকার ক্ষতম, যুদ্ধকালীন রাষ্ট্র শত্রু নিধনে কোনো অপরাধ নাই। এসব কথা যত বীরোচিত বা সফলতার বা কী হোকনা কেনো আমার জন্য, আমার শুনতে এখন কিছুই ভাল লাগেনা, আমার সে জগত উবে গেছে বহু আগে, তা কাকে বুঝাই, কী করে বুঝাই বা কী। আজাহার চাচা জানাল আমি দেশে আর কোনোদিন আসবো না ধারনা করে আমার জায়গা জমি সব মানুষে দখল করে নিতে চায়, তিনি নাকি মূল বাড়ীর চারদিকে তারকাঁটার বেড়া দিয়ে রেখেছেন, এবং সবাইেকে বলেছেন তাকে নাকি আমি আমার সম্পত্তি দেখেশুনে রাখতে বলেছি, তাই আর কেউ দখন নিচ্ছেনা। দেখলাম তাদের লিভিং রুমে আমার আর বাবার একটি ছবির পেইন্টিং, বন্দুকের বাট মাটিতে, দুনালার মাথায় মুঠ করে ধরা বাবার হাত, আমি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। আমাকে ও আমার ছেলেবেলার একটি মুহুর্ত এইভাবে দেখে আমার খুব অস্বস্তি লাগলো। আজাহার চাচা নিজেই জানালেন এই ছবিটা কার কাছ থেকে কিভাবে পেয়েছেন।আর্ট কলেজের কোনো এক প্রফেসরকে নাকি অনেক টাকা দিয়ে পেইন্ট করিয়েছেন। আজাহার চাচা তথ্য আরো যোগ করলেন, আপানার চাচীই চাইল এই ছবিটা এইভাবে করতে, কেউ এসে জিজ্ঞেস করলে আপনার ছবি দেখেয়ে আপনার বাছা আপনার ছবি দেখিয়ে বলে, এই, এই মেয়া হইল যাইয়া আমার বাবাজানের মত, দ্যাখতে এবং কামে কিন্তুক হারাইয়া গ্যাছে, জ্যান্ত হারানো। আমি শুধু তাদের কথা শুনে যাই, আর ক্রমাগত আমার পাইপে টোবাকো টানতে থাকি। আজাহার চাচা অসীম আগ্রহে আরো তথ্য দিতে থাকে যে তিনি এখন বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য, এই হিসেবে যে, তিনিই প্রথম ব্যাক্তি যিনি সবার আগে একটি রাজাকার মেরেছিলেন, সম্প্রতি এনিয়ে নাকি প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, টেলিভিশন গুলো তার সাক্ষাতকার নিয়েছে, তিনি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী আর কাশ্মীরী শাল পরে টেলিভিশনে মাক্ষাত্কার দিয়েছেন। আজাহার আলীর এতসব কোনো কিছুতে আামার কিছু যায় আসে না, আমার সে জীবন বোধ আর নেই, কী করে তা বলি, কী করে তা বুঝাই। তবুও কেনো যেনো মনে হলো একবার জিজ্ঞেস করি উটচোঙ্গা ছয়ফুরের স্ত্রীর কথা। যদিও আমি জানি আমি তা করবো না, আমি অশৈশব এমনতর কোনো প্রশ্ন না করা লোক। তারপরও দেখি আজাহার চাচা নিজেই বিষয়টি আনলেন, তার আগে তিনি তার স্ত্রী জোহরা বাছাকে ভেতরে যেতে বললেন এই বলে যে তিনি আমার সঙ্গে বিশেষ কথা বলবেন। জোহরা বাছা চলে গেলেন, আজাহার আলী আমাকে বললেন আপনার কী জানতে ইচ্ছে করেনা উটচোঙ্গার পরিবার সম্পর্কে? আমি বললাম জি বলেন বলেন। আজাহার চাচা জানালেন যে তারাও ভাল আছে। এইটুকু বলে চুপ থাকলেন। একদম শেষে বললেন একটু কাছে এসে, আমার হাত ধরলেন, বাজান আমি কিন্তু তার পর থেকে ওই মহিলার প্রতি পিরীতি বোধ করি, কোন্ মহিলা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো, আমি সে প্রশ্ন করিনা, আমার চোখের দিকে গভীর তাকিয়ে কী বুঝল কেজানে, বলল, ওই যে উটচোঙ্গা ছয়ফুরের বউ, তার প্রতি, হ’ তার প্রতিই পীরিতী বোধ হইল আমার, তবে বাজান বিশ্বাস করেন আমি তারে আর কিছু করি নাই, ওরে চল মাইরা কথা দিছিলাম, নইলে তার কাছে যে যাইতে ইচ্ছা করে নাই তা না, তাও বোধ করছি। আজাহার চাচা এভাবে কথা বলতে থাকেন। আমি কেমন করে বলি আমার কোনো কিছুতে কোনো কিছু যায় আসেনা আজাহার চাচা, এসব আমার শুনতে কিছুই ভাললাগেনা, বড় অপ্রয়োজনীয় গল্প এসব আমার কাছে। আমি আমার পাইপএ ঠেসে ক্যাপ্টেন ব্লাক লাইট অবিরাম টানি, ধোয়ায় ঘর ভরে ফেলি। আজাহার আলী আমাকে হয়তো আরো চমকাতে চাইল অথবা ভাবলো আমি চমকাবো, তিনি জানালেন জোহরা বাছার অনুমতি নিয়ে তিনি গোপনে বিধবা উটচোঙ্গার স্ত্রীকে বিয়ে করে মেলা-মেশা করলে তার সন্তান আসে, তড়ি-ঘড়ি তার পর আমি তার বিয়ের ব্যবস্থা করি, সেই ছেলে এখন বড় হয়েছে তবে আমার পরিচয়ে নয়, আপনেরে যে গাড়ীতে চালাইয়া নিয়া আইল সেই আমার ওই ঘরের ছেলে, তার নাম সোহরাব। আমি অবাক হইনা, অবাক হওয়ার কিছু নেই এতে, কিন্তু তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন আমি যেনো এই তথ্যটি রুস্তমকে জানাই, কেনোনা তিনি এই পাপবোধ নিয়ে মরতে চাননা বড় ছেলেকে না জানিয়ে।
ও! আর হ্যা আমারই এখন মনে হলো ওই দিন অর্থাত্ আজাহার আলীর চল গাঁথার দিন বা উটচো্ঙ্গা আজাহারের মার্ডারের দিন ছিল ২৫ মার্চ ১৯৭১। ফলে উটচোঙ্গা মার্ডারের পরেরদিন আর পুলিশ আসেনা।
হোটেলে ফিরে আমার এক অর্থপূর্ন পুরো বোতল ব্লাক-লেভেল পানের কারন তৈরী হল। কারন ছাড়াও আমি তাই-ই করতাম। আজকাল আর গেলাশ, বরফ এসবের আনুষ্ঠানিকতা করতে ভাল লাগেনা। ক’টা দিনই বা আর, এত আনুষ্ঠানিকতা করে কি হবে। আজকাল ঘন ঘন মাকে স্ব্প্ন দেখি, আমার শিশু-বেলা, মা আমর জুতার ফিতা বাধছে কিন্তু যখন আমার মাথার চুল আঁচড়াতে আসে একই স্বপ্নে তখন আবার আমার অনেক বয়স, পেছনের দিখে চুল আচরাতে আচরাতে বলে, শোনো তোমার কোনোদিন চুল শাদা হচ্ছে বা পরে যাচ্ছে তা যেনো আমার দেখতে না হয়। তার এধরনের কথায় আমি কোনো সাড়া দেইনা, সেই আমি, মা বলে- শয়তান কোনো কথা বলেনা, তারপর আবার নিজেই বলে, তুই খুব আমাদের প্রত্যাশিত ছেলে, চার মেয়ের পর তোর জন্ম, অথচ কি অনানুষ্ঠানিক জন্ম তোর, কারন আমরা ভয় পেলাম তোকে নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিকতা তোর জীবন হয়তো শেষ হয়ে যাবে। তার এ কথার সময় আমি একটু হাসি, সেই যে আমি। ঢাকায় খুব জলীয় বাষ্প, অনেকটা জাকুজি গরমের মত, রুমের এসি বারিয়ে দিয়ে স্যুট পরলাম, মান্টির কিনে দেয়া টাইও আলগা করে দক্ষিন-পূবের আকাশে মগবাজার নিউ ইসকাটনের দিগন্তে চাঁদ দেখতে দেখতে খালি স্টোমাকে কার্পেটে মৃত্যু চর্চার মত ঘুমালাম, সেই দিগন্তে আদৌ চাঁদ ছিল কিনা ঠিক নিশ্চিত বলতে পারিনা এখন। এর নাম দিলাম নিজের কাছে নিজে– ঢাকার চাঁদ দেখা। ঢাকার চাঁদ খুব বিষন্ন, আমার তেমনই মনে হলো, হয়তো অন্য কারো কাছে তা নয়। আমি পৃথিবীর অনেক কিছুই জানিনা মনে হচ্ছে।
নিউইয়র্কে আর একদিন আমি আর রুস্তম স্টেক-হুইস্কি খেলাম, ওকে ওর বাবার দেয়া তথ্যটি দিলে ও জানাল দাদা আমি জানি তা, আমি যে জানি সে কথা বাবা জানেননা। আমি উপলদ্ধি করলাম ও আমার প্রতিক্রিয়া বুঝবার চেষ্টা করছে, আমিও বুঝলাম ওরও কিছু যায় আসেনা এমন মনোভাব। সেখানেই আমাদের সেদিন শেষ, হয়তো সারা জীবনের জন্যও শেষ। যদিও রুস্তমের সঙ্গে একটি অপ্রসাঙ্গিক বিষয় জড়িত হলো। আমার অসুখের ধরনের কারনে আমার মৃত দেহের কোনো অরগ্যান আর কাজে লাগবে না বলে এমনতর অভিযোগেরর প্রেক্ষিতি ইন্সুরেন্স কোম্পানী চাপাচাপি করলো তাদের ডেডবডির একজন ক্লেইমার দরকার, যাদিও তার বিকল্প ব্যবস্থা করা আছে ‘ছাইকরন’। আমি বাধ্য হয়ে রুস্তম এর নাম দিলাম। রুস্তম এভাবে আমার নাম্বার্ড দিনের খবর পেয়ে খুব সহানুভুতিশীল হয়ে পড়লো। ওর ওই সহানুভুতিশীল চোখ দেখে আমাদের স্টেক-হুইস্কী পর্ব শেষ হয়ে যায়। সেক্রটারী একদিন তাকে জানিয়ে দিল যে খুব দেরীতে নয় ওর ইন্সুরেন্স কোম্পনী ও হসপিটাল আপনাকে যোগাযোগ করবে, তার আগে আর তার সঙ্গে আপনার আর দেখা বা কথা হবেনা। সেক্রেটারী যখন আমাকে জানাল যে সে একথা রুস্তমকে বলে দিয়েছে, আমার জানতে ইচ্ছে করলো সে কিছু বলল কিনা, যথারীতি না জানতে চাইলেও জেনিফার বলল, লোকটি চিত্কার দিয়ে কেঁদে উঠল। দেখলাম জেনিফার সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে, আমি তার দিকে তাকিয়ে ডান চোখ উইঙ্ক করে তার তাকানোকে স্বাগত জানালাম, আর বললাম, পুওর রস্তম। পুওর রুস্তম বলবার পর আমি না বোঝার এ্যাক্ট করি জেনিফারের প্রতিক্রিয়া, মনে হচ্ছে এবারে তার কাঁদবার পালা শুরু হবে, ওসব বুঝতে চাইনা আমি, ততক্ষনে রুমের কোনার টেবিলে বাবা-মায়ের একটি ছবির দিকে চোখ পড়লো, হয়তো সে চোখ এমনিতেই পড়লোনা, নিজেই চোখ দিলাম, মনে মনে এই সত্যকে ধন্যবাদ জানালাম। সইে ফাকেই আমাদের অসমাপ্ত কথার শেষে জেনিফার বলল, এক্সাটলি! অর্থাত্ পুওর রুস্তম! ক্যাপ্টেন ব্লাক তামাকে পাইপ ঠাসলাম, মনে হলো পাইপে তামাক ঠাসা আমার খুব প্রিয় কাজ, ড্রয়ার খুলে রুম টেম্পারেচার্ড সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে তৃপ্তি পেলাম এই ভেবে যে অন্তত আমার ছেলে বেলা বা আমার বেরে ওঠা জনপদের একজন থাকল যার মন খারাপ হবে বলে আগেই জানলাম। এর পর নিজের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে উপহাসের হাসি হাসলাম, সে আমার বিনোদন।
আজাহার চাচা যখন উটচোঙ্গা ছয়ফুরের স্ত্রী কাহিনী শেষ করেছে তখন আমারও কিছু একটা ইচ্ছে হলো, বললাম- আজহার চাচা আপনি এবারে ভিতরে যান, জোহরা চাচীকে পাঠান আমার তার সঙ্গে আলাদা কথা আছে। আমি জোহরা চাচীকে বললাম যে আজাহার চাচা কোনো কারন ছাড়া এমন কথা শোনালো যা আমার শুনবার কোনো আগ্রহ নেই বা ছিলনা। যেহেতু তিনি বাধ্য করলেন তাই আমারও সেই তাফালে ল্যাজা কোপানো ক্ষামি মারা বালক হতে ইচ্ছে করছে জোহরা চাচী, অতএব আপনাকে জানতে চাইছি-উনি যেমন উটচোঙ্গার বউকে পিরীতি বোধ করেরেছন এবং আপনার অনুমতি ক্রমে গোপন বিয়ে করে সন্তান নিয়েছেন, সেই ছেলের নাম রেখেছেন রুস্তমের নামের সঙ্গে মিলিয়ে সোহরাব, ইত্যাদী, আপনার কী কোনো কিছু অমন বলবার আছে আমাকে চাচী? জোহরা চাচী কোনো জড়তা না দেখিয়ে সোজা বলা শুরু করলো- যেনো এমন একটা কথা বলবার জন্যই আজ আমাকে ডেকেছেন- জ্বী, আমি আপনার বাবা মাইজ্যা ভাইর প্রতি ভালবাসা বোধ করতাম, এবং আপনাকে আমি আমার ছেলের মত দেখি, যেনো আপনি আমার পেটে হয়েছেন, আপনার বাবার সঙ্গে। আমি জোহরা চাচীর মাথায় আবার হাত দিলাম, তার আগে পাইপে টান দিয়ে নিলাম, পাইপ থেকে পোড়া তামাকের ধোয়া আমার চোখে গেলে চোখ দিয়ে পানি বেরুল, তিনি বললেন আপনি দেখতে আপনার বাবার মতন আর এমন করে এত ধোঁয়া টানবেন না আপনার বাবার মত আমার বাবা।
আমার মনে হলো আমার আর একদিন রুস্তমকে ফোন করে বলতে হবে যে জোহরা চাচীকে যেনো আমার সম্পর্কে কোনো খবর না দেয়া হয় তার জীব্দ্দশায়। আসলে আমি কেন ফোন করবো, জেনিফারকে বলবো আমার হয়ে ও-ই রুস্তমকে বলে দেবে।

Leave a Reply