দিলারা হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

দিলারা হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

 

বাইশে শ্রাবণ

বাইশে শ্রাবণকে কাছে ডাকতে নেই,

দূরেই তাকে মানায় ভালো,

কাছে এলে কেমন যেন হুলুস্থুল বেঁধে যায়

পাওয়া জিনিশ হারিয়ে যায় খানিক বাদেই;

দূরে দাঁড়িয়ে দেখো সব কিছু

কেমন দেখতে ভালো

জানাশোনায় আলগে রাখে পথ;

এখানে বসেও আজ দেখতে পাই শান্তনিকেতন

ভুবন ডাঙ্গারতন পল্লী

জোড়াসাঁকো যেমন আছেতেমনি থাক

কাদম্বরির জল বাতাসে

পৌষমেলায় ছড়ানো ছিটানো 

সে সকল তৈজষ পত্র

মেলার মাঠে কাঁদছে কী খুব?

ছাতিমতলার শূন্য বাগান

ভর দুপুরে উদাস ভীষণ?”

মাটির তৈরী ‘শ্যামলীগৃহে

দেখো তো দেখিপরিপাটি

কোল বালিশটি উল্টে আছে আজ

এই সুবাদের দু:খগুলো

ম্যাগপাইস পাখির মতো 

চন্চুতে আজ লুকিয়ে পড়ে বেশ

তুমি ছাড়া পাশে আর কেউ নেই যার

তাঁকে তুমি কি বলবে আজবলো?

মানুষ  

মানুষের পিপাসারা  আলোকবর্ষ  ছুঁতে পারে,

ছুঁতে পারে হিমাঙ্কের নিচে থাকা অচেনা কুসুম 

শব্দেশিল্পে ধরে রাখে সেই তার সমগ্র জীবন 

পাথরে পাথর কেটে গড়ে তোলে অজান্তা ইলোরা

হারানো হ্রদয় পথে যেতে যেতে আজো সে মানুষ 

বিপুল বিচ্ছেদে কাঁদেভালোবেসে আর অভিমানে,

প্রথম চুম্বন স্মৃতি আজো তাকে চুম্বকের মতো টানে

অতর্কিতে কেঁপে ওঠে ফের বিস্মৃতির  জলাভূমি।

ভালোবাসাছুঁয়ে দিলে জ্বলে ওঠে মণিদীপ আলো ,

ভুলে ভালে এই বেঁচে থাকাকত অসামান্যবলো?

একাকীত্ব

একাকীত্বকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাই নিজেই,

ধুপগন্ধ বাতাসে ওড়ে তার আসন্ন ধরিত্রীর বাসনা

কোথায় রাখিকোথায় যে বসাইসেতো জানে তার মতোই।

অন্ধকারে নয়নৃত্যের বহূমুখি মুদ্রায় তাকে নাচাই ভীষণ,

তা তা থৈ থৈথৈ থৈ তাতা

গোধূলি আলোর পথ ভেঙ্গে যেতে যেতে ফিরে তাকাই

ক্যারেবিয়ান সাগরের নীল জলের চোখে……

হঠাৎ সবুজ পথিকেরা এসে হৈ চৈ বাঁধিয়ে দেয় মনে

দ্বিধাদ্বন্দ্বের বাষ্পগুলো মেঘের ঘরবাড়িআঙ্গিনা

ডুবিয়েমিলিয়ে যায় দূরে…..

বাস্কেট বলের মতো অস্তগামী সূর্যটাকে নিয়ে 

দারুণ লোফালুফি খেলি দুইজনে,

কে কাকে জিতিয়ে দেবো এমন অসঙ্গত খেলায়

তাই নিয়ে নতুন করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হতেও

ফিরে আসি তার কাছেযে আমাকে একলা করেছে,

একলা করেছে ভীষণ…….

অপূর্ব সব কার্পাস ফুটে আছে একাকীত্বের এই বাগানে

কী ভীষণ সুন্দর—-

চারপাশে তার হাজারো মানুষসেই ভীড়ের মধ্যে তবু 

তুমিও অন্যতম একজন——

হাট ভেঙে দিতে হয়েছিলে সাহসী;

সেসব দু:খবীণার সুর ভুলে গিয়ে 

তবু আমি ফিরে যাই তার কাছে

যে আমাকে একলা 

করেছে ফের।

ভূমিলীলা 

ভূমিলীলা আজ কবরের ঘাসেতাই দেখে লীলাবতী কন্যা এক উদাস নয়নে তাঁরে খোঁজে

সহজিয়া অনুরাগে মৃত্যুকে ডেকে কথা কয়,বেঁধে রাখে তারে 

আলস্য সূতোয়,

লাবণ্যের বহুমুখি শেকড়েবাকড়ে বাড়ে বস্তুবাদের ঘোড়া

আমি সে ভূমিতে বন্যগড়াগড়ি যাই

কিছু না দেখেনা শুনেই

লুটোপুটি খেলি সারাদিন;

একদিন ফুটেছিলাম যদিও পাহাড়ের  পাদদেশে 

তবু জানিআমি চিরন্জীব কিছু নই,

যে কারু হাতের ছোঁয়া পেলে আলতোই ঝরে পড়ি 

সহজ সুন্দর গন্ধে সকালের জুঁই

এমন কী শৈশবের ফড়িং 

আর যৌবনের প্রজাপতি 

তাদের পাখার স্নিগ্ধ বাতাসের মোমে ভেসে যাই 

অচেনা গ্রহের মনোহীন এক স্রোতে।

বায়ুভূক মেঘের দিকে যেতে যেতে 

ঝুমবৃষ্টির শ্বাসাঘাতে

আমি খুঁজে পাই স্বরবৃত্তের ঘরদুয়ারআঙ্গিনা

শিপ্রা নদীর পথে যেতে যেতে দেখা হয়

কালিদাসের মন্দাক্রান্তা সঙ্গে,

সেখানে চিরকালের বিরহী যক্ষ 

এখনো তার প্রিয়ার জন্যে কাঁদছে

দেখো তো বন্ধুরাপ্রযুক্তির এই যুগে 

এসব কি আর সাজে?

তবু সে অলকাপুরীর উদ্দেশে 

কুরচি ফুলের অর্ঘ্য পাঠায় রোজ

উত্তর মেঘের ম্যাসেন্জারে

বিচ্ছেদের হাইহ্যালো ছাড়া 

আজ আর তাকে 

কিছুই বলতে পারিনি এই আষাঢ়ে।

কাহারবা তাল

দু:সহ স্মৃতির আয়নায় তার মুখ

দেখি ফিরে ফিরেযেন সেই একমাত্র

অনিবারদ্যুতিময় সেই  আঁখিজল;

আত্মার গভীরে তার দূরআহবান…..

এমন কাঙালপনাভিখিরী বিনয়

জেনেও তাকেই  তুমি ভালোবাসা দিলে,

কিছু নেই যারতাকে দিলে অভিমান

গন্তব্যবিহীন পথে কাহারবা তাল!

ছবি

আমার হাতে কিছু রঙ ছিলোছবি আঁকতে পারতাম

মাইকেল এ্যান্জেলোর সিসটিন চ্যাপেলের মতো নয়,

রাফায়েল কিংবা লিওনার্দো দা ভিন্চির

 মতো না হোক;

সেই রঙে আমি আজ জাতির পিতার ছবি

আঁকতে চাইআমার আনাড়ি হাতে।

জলরঙে সে মুখাবয়ব খুব তেজোদীপ্ত হবে না হয়তো

তেলরঙে অবশ্যই আমি আঁকতে পারবো সেই ছবি;

স্বাধীন ভূখণ্ডের যিনি স্থপতি স্বপ্নের

স্থির দাঁড়িয়ে আছেন আজো স্বাধীনতার সিংহ দরোজায়

যিনি আমার নমস্য পিতাতোমার পিতাআমাদের পিতা

তিনি আজ সন্তানের রঙতুলিতে ফুটে উঠবেন সমুজ্জ্বল,

যেন এক অদেখা রাজর্ষি;

রক্তের কিছু লাল রঙ আলপনায় বিছিয়ে দেবো 

তাঁর পায়ের তলায়সিঁড়ির গোড়ায়;

কালো রঙে বয়ে যাবে অবিনশ্বর এক দু:খস্রোত

বাঙালি জাতির আনন্দবেদনার দুই যুগপৎ….

দৃশ্যমান তাঁর সেই তর্জনী যেন হাজার বছরের বাঙালি

বাদেপ্রতিবাদে সাতচল্লিশ থেকে মহান একাত্তরে

লালসবুজ পতাকার নিচে এক রাজার মুকুট।

সমুদ্র শামুকের মতো আবেগময় তাঁর দুটি চোখের গোলক 

সর্বকালের কাজলে মাখা নিশিদিন,

আজো তাঁর মায়ামমতা আর ভালোবাসা স্রোত

এদেশের মানুষের জন্যেযাদেরকে তিনি 

ভালোবাসতেন  প্রতিটি শস্য দানার মতো।

শ্যামল সবুজ  বাংলাদেশ নামের সোনালি এই ভূখণ্ডে 

শতবর্ষী এক তরুণ যিনিআজো তিনি পরাক্রান্ত নবীন।

রাজসিক তাঁর জন্মশত বার্ষিকীতে 

সকল শিশুর হাতে আমার আঁকা

এই ছবিটি আমি তুলে দিতে চাই 

Leave a Reply