চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান :: ইশরাত তানিয়া

চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান :: ইশরাত তানিয়া

আজকের সকালটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল। পৃথিবীর সমস্ত রূপ-রস-মাধুর্য-বেদনা-মলিনতা ছেড়ে একজন লেখককের চলে যাওয়ায় শোকার্ত হয়ে উঠল চারপাশটা। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান। অ্যাপোলো হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা অবস্থায় তাঁর শেষ নিঃশ্বাস মিশে গেল বাতাসে।

১৯৩৯ সালে কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন রিজিয়া রহমান। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারের  সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন। লেখা শুরু করেন ষাটের দশক থেকে। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তবে তাঁর মূল পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবেই। বং থেকে বাংলা, রক্তের অক্ষর, শিলায় শিলায় আগুনের মতো বিষয়ভিত্তিক কালজয়ী উপন্যাস তিনি রেখে গেলেন অগনিত পাঠকের জন্য। তাঁর সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস  ‘বং থেকে বাংলা’। এ উপন্যাস বাঙ্গালী জাতিসত্তা গঠনের ইতিহাস, বাংলা ভাষা বিবর্তনের ইতিহাস। আড়াই হাজার বছর আগের বং সম্প্রদায় থেকে শুরু হয়ে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ উপন্যাসের বিস্তৃতি। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘর ভাঙা ঘর, উত্তর পুরুষ, ধবল জ্যোৎস্না, সীতা পাহাড়, উৎসে ফেরা, আবে-রঁওয়া। রিজিয়া রহমান উপন্যাসে অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশক, সম্পাদক ও পাঠক শ্রদ্ধা ও শোকানুভূতি প্রকাশ করেছেন। “রিজিয়া (রহমান) আপা, আপনার লেখাগুলো থাকল”, লিখেছেন  কথাসাহিত্যিক মইনুল আহসান সাবের।

কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান লিখেছেন, “একজন নিভৃতচারী ও প্রকৃত কথাশিল্পীর প্রয়াণ হলো। যিনি কখনো নিজেকে কোনোকিছুরই জন্য কাঙাল করে তোলেননি। তাঁর লিখিত রচনা  গড়পড়তা নয় বরং তাঁর একেকটা উপন্যাসকে ডক্যুমেন্টশন বলা চলে। তীক্ষ্ণ  মেধা ও অক্লান্ত  পরিশ্রম ছাড়া এ ধরনের কাজ প্রায় অসম্ভব ছিল। বাংলাসাহিত্য এই মহান লেখকের কাছে আজীবন ঋণী থাকবে। অনিঃশেষ শ্রদ্ধা”।

“শক্তিমান কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান চলে গেলেন! প্রচার-নোংরামি, দলবাজি, তোষামোদ, ব্যক্তিগত যোগাযোগের বাইরে থেকে নিজের কলমের জোরে যে সাহিত্যে স্থান করে নেওয়া যায়, তিনি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁকে দেখে আমি এবং আমার মতো মফস্বলবাসী অনেকেই সাহস পেয়েছিলাম। নিজেদের কলমের ওপর আস্থা রাখতে শিখেছিলাম”, লিখেছেন কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার।

অধ্যাপক ও লেখক গীতিয়ারা নাসরীন লিখেছেন, “চেনা এই ছবিটাই নিলাম। ছবিটা সেই পড়তে শেখার সময় থেকে দেখেছি ‘বেগম’ পত্রিকায়। ‘ঘর ভাঙা ঘর’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হোতো ‘ললনা’য়। এইসব পত্রিকা আর পঠন দিয়ে গড়ে উঠেছে আমার শৈশব। বং থেকে বাংলা, শিলায় শিলায় আগুন পড়েছি সম্ভবতঃ বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় (কল্পনা জানালো বং থেকে বাংলা ‘বেগম’ পত্রিকাতেই ধারাবাহিক প্রকাশ হতো)। আরও যে কতো! তখন পঠনের কাল ক্ষণস্থায়ী ছিল না। প্রভাবও জীবনব্যাপী। রিজিয়া রহমান, আপনি বেঁচে থাকুন ধবল জ্যোৎস্নায়, সূর্য সবুজ রক্ত, রক্তের অক্ষরে।”

কবি পিয়াস মজিদ লিখেছেন, “রিজিয়া রহমান আপা, আবার কবে আপনি পরম মমতায় স্বাক্ষর করে বই উপহার দেবেন আমাকে? নিশ্চয়ই দেবেন। এমন অমর কথাকারের কি কোনো স্বাক্ষর হতে পারে মৃত্যুখাতায়? একমাত্র অমরতার অক্ষরেই চিরকাল লেখা হবে আপনার নাম; রিজিয়া রহমান।”

 

আমাদের সৌভাগ্য রিজিয়া রহমানের মতো প্রতিভাকে সম্মান জানাতে পেরেছি। উল্লেখ্য যে ‘কালি’ সাহিত্য সংগঠন গত ৬ জুলাই, ২০১৯ তারিখে সাহিত্যে আজীবন অবদান রাখার জন্য রিজিয়া রহমানকে সম্মাননা প্রদান করে সম্মানিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কথাসাহিত্যিক আফরোজা পারভীন বলেন কৈশোর থেকেই তিনি রিজিয়া রহমানের মেধা, প্রজ্ঞা, ইতিহাস চেতনা, নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, মানুষের জীবনের পাঠ, লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি আর অতলস্পর্শী গভীরতার কাছে নতজানু। তিনি রিজিয়া রহমানের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত উপন্যাসগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

 

শারীরিক অসুস্থতার জন্য রিজিয়া রহমান সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি তাই সে রাতেই তাঁর বাসায় সন্মাননা স্মারকসহ বাকি উপহার পৌঁছে দেয়া হয়। সম্মাননা স্মারকটি ছিল চিত্রশিল্পী মাসুক হেলালের আঁকা রিজিয়া রহমানের প্রতিকৃতি। আন্তরিকভাবে রিজিয়া রহমান সম্মাননা গ্রহণ করেন এবং একান্ত ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। স্ট্রোকের আঘাত তখনও সামলে উঠতে পারেননি। তবু মৃদু স্বরে সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন কথা বললেন। কালি’র জন্য শুভ কামনা জানালেন।

 

রিজিয়া রহমান একজন নিভৃতচারী, সংবেদনশীল এবং আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন লেখক ছিলেন। তাই জীবদ্দশায় গণমাধ্যমে তিনি ছিলেন উপেক্ষিত এবং অবহেলিত। তবু দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়- তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর আধুনিক ও মননশীল সাহিত্য কর্মে। অগণিত পাঠকের মনে। মৃত্যুতেও তিনি চিরজীবী। একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর অজর অমর নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে।

Leave a Reply